Voter list survey across the country in August! :দেশজুড়ে আবার শুরু হচ্ছে এক গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক প্রক্রিয়া—ভোটার তালিকা সমীক্ষা। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, যদি সবকিছু ঠিকঠাক চলে এবং আদালতের রায় অনুকূলে আসে, তবে আগামি আগস্ট মাস থেকেই শুরু হয়ে যাবে সর্বভারতীয় ভোটার তালিকা সংক্রান্ত নিবিড় সমীক্ষা। তবে এখনই নিশ্চিত তারিখ ঘোষণা করা হয়নি, কারণ বিষয়টি আপাতত সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধীন। মূলত বিহারে এই সমীক্ষা ঘিরেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক উত্তেজনা। অভিযোগ উঠেছে—এই সমীক্ষা আদতে নির্বাচনী কারচুপি ও ভোটের অযোগ্য নাগরিকদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া, যেখানে বিশেষত সংখ্যালঘু ও অনুপ্রবেশকারীদের টার্গেট করা হচ্ছে। বিহারে এমন ভোটার যাচাই প্রকল্পের অন্যতম মুখ্য উদ্দেশ্য হল—বেআইনি অনুপ্রবেশকারীদের এবং অযোগ্য ভোটারদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া। কেন্দ্রীয় সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটি সম্পূর্ণভাবে সাংবিধানিক অধিকার অনুযায়ী এক স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে দেশের ভোটার তালিকা আরও বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য হবে। কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর একাংশের অভিযোগ—এই তালিকা সংশোধনের নামে বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষদের নিশানা করা হচ্ছে, যা দেশের ঐক্য ও গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক হতে পারে। এ প্রসঙ্গে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার সরাসরি কিছু না বললেও, জেডিইউ-র এক বিধায়ক বলেন, “আমরা চাই স্বচ্ছ ভোটার তালিকা, কিন্তু তার আড়ালে যেন কোনও সম্প্রদায়কে টার্গেট না করা হয়।” অন্যদিকে বিজেপি নেতারা এই সমীক্ষাকে স্বাগত জানিয়ে বলছেন, “ভোটার তালিকা বিশুদ্ধ হওয়া দরকার।
বেআইনি অনুপ্রবেশকারীরা যেভাবে দেশজুড়ে ভোটাধিকার পাচ্ছেন, সেটা আটকানো খুব জরুরি।” নির্বাচন কমিশনের এক আধিকারিক জানান, “এই সমীক্ষা সম্পূর্ণভাবে তথ্যভিত্তিক ও নিরপেক্ষ পদ্ধতিতে হবে। আধার কার্ড, জন্ম সনদ, স্থায়ী ঠিকানার প্রমাণ—এইসব তথ্য যাচাই করে তবেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কোনও বৈষম্যের প্রশ্নই নেই।” নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে রাজ্য নির্বাচন অফিসারদের ইতিমধ্যেই নির্দেশ পাঠানো হয়েছে, যাতে মাঠ পর্যায়ে প্রস্তুতি নেওয়া শুরু হয়। সেক্ষেত্রে বুথ স্তরে ভোটারদের তথ্য যাচাই, নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি এবং অকার্যকর ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার কাজ শুরু হবে আগস্ট থেকেই। বিহারে পরীক্ষামূলকভাবে এই সমীক্ষা শুরু হয়েছে, যেখানে কিছু এলাকায় বাড়ি-বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এখানে আধার ও ভোটার কার্ডের ডেটা মিলিয়ে দেখা হচ্ছে এবং কোনও অসঙ্গতি ধরা পড়লে সেই ভোটারকে সাময়িকভাবে তালিকা থেকে সরানো হচ্ছে, যতক্ষণ না প্রমাণপত্র জমা পড়ছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে এই সমীক্ষার গতি আরও ত্বরান্বিত করা হচ্ছে, কারণ সেখানেই অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের সংখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে। অন্যদিকে এই সমীক্ষা ঘিরে জনমনে এক ধরণের আতঙ্কও তৈরি হয়েছে। গ্রামীণ এলাকার বহু মানুষ, বিশেষ করে বৃদ্ধ ও অশিক্ষিত নাগরিকরা বুঝতেই পারছেন না কেন হঠাৎ করে ভোটার তালিকা যাচাই শুরু হল। কেউ কেউ ভাবছেন, তাঁদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে! পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট এলাকার এক বাসিন্দা, ৭২ বছর বয়সী সানাউল্লা মোল্লা বলেন, “আমি তো জন্ম থেকেই এখানেই থাকি, ভোট দিই বছরের পর বছর। হঠাৎ এখন কীসের যাচাই?” মানবাধিকার কর্মী অনুরাধা সেন বলেন, “এই সমীক্ষা স্বচ্ছ হোক, সেটা আমরা চাই। কিন্তু সেটা যেন জনসাধারণের মধ্যে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক বা সাম্প্রদায়িক বিভাজন না ঘটায়, সেই দায় নির্বাচন কমিশনকে নিতে হবে।” প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে এনআরসি ও এনপিআর নিয়ে দেশজুড়ে যে আতঙ্কের আবহ তৈরি হয়েছিল, তার স্মৃতি এখনও অনেকের মনে টাটকা। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এই ভোটার যাচাই অভিযান তারই একটি নতুন রূপ না হয়ে দাঁড়ায়।

তবে সরকারের দাবি, এই সমীক্ষার সঙ্গে এনআরসি বা এনপিআরের কোনও সম্পর্ক নেই। এটি নিছকই একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ভুল তথ্য বা একাধিক ভোটার আইডি ব্যবহারকারীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদিও এইসব ব্যাখ্যা সাধারণ মানুষের কাছে ঠিক কতটা গ্রহণযোগ্য হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সামনে একাধিক রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন ও ২০২৯ সালের লোকসভা ভোট মাথায় রেখেই সরকার ভোটার তালিকা বিশুদ্ধ করার কাজে জোর দিচ্ছে। ভবিষ্যতে এই তালিকা যদি সন্দেহজনকভাবে কোনও সম্প্রদায়কে বাদ দেয়, তাহলে তা নিয়ে বড়সড় রাজনৈতিক সংকট তৈরি হতে পারে। তবে ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ, অসম, ত্রিপুরা, উত্তরপ্রদেশ, বিহার সহ একাধিক রাজ্যে ভোটার তালিকা যাচাইয়ের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়েছে। স্কুল-কলেজ, পঞ্চায়েত ভবন, ব্লক অফিসে সাধারণ মানুষ যাতে সহজে তথ্য জমা দিতে পারেন, সেজন্য বিশেষ ক্যাম্পও করার পরিকল্পনা রয়েছে। ভোটার তালিকা যাচাইয়ের এই উদ্যোগ একদিকে যেমন এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাজ, অন্যদিকে তা রাজনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত স্পর্শকাতর। সব মিলিয়ে আগস্ট মাস থেকে এই দেশজুড়ে ভোটার যাচাই অভিযান শুরু হলে একদিকে প্রশাসনিক দক্ষতা এবং অন্যদিকে জনগণের সচেতনতা ও আস্থা—এই দুইয়েরই কঠিন পরীক্ষার সামনে দাঁড়াবে আমাদের গণতন্ত্র। সাধারণ মানুষের একটাই আবেদন—”আমাদের নাম যেন ভোটার তালিকা থেকে ভুল করে বাদ না যায়!” আর প্রশাসনের একটাই অঙ্গীকার—”এই প্রক্রিয়া হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতায়।”