Sunita Williams is coming to her homeland India:মহাকাশের বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা নিয়ে ভারতীয় বংশোদ্ভূত মহাকাশচারী সুনীতা উইলিয়ামস এবার নিজের শিকড়ের টানে পিতৃভূমি ভারতে আসছেন। পৃথিবীর কক্ষপথে কাটানো দীর্ঘ নয় মাসের মিশন শেষে ১৯ মার্চ তিনি পৃথিবীতে ফিরে আসেন। মহাকাশ থেকে ফেরার পরই তিনি জানান, শিগগিরই তিনি ভারত সফরে আসবেন এবং ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ISRO)-এর বিজ্ঞানীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। তাঁর এই সফর নিয়ে ইতিমধ্যেই ভারতজুড়ে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, কারণ তাঁর মতো একজন কিংবদন্তি নভোচারীর উপস্থিতি ভারতীয় মহাকাশ গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সুনীতা উইলিয়ামস: এক অনুপ্রেরণার নাম
সুনীতা উইলিয়ামসের জন্ম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হলেও তাঁর শিকড় রয়েছে ভারতে। তাঁর বাবা দীপক পাণ্ডে গুজরাটের ঝুলাসান গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। মা বনি পাণ্ডে আমেরিকার নাগরিক হলেও ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি সুনীতার গভীর ভালোবাসা রয়েছে। মহাকাশে থাকাকালীনও তিনি একাধিকবার ভারতের কথা বলেছেন, ভারতীয় খাবারের প্রতি তাঁর ভালোলাগার কথা প্রকাশ করেছেন এবং মহাকাশ থেকে ভারতকে দেখার অনুভূতিও ভাগ করে নিয়েছেন।
মহাকাশ থেকে ভারতকে দেখা: সুনীতার অভিজ্ঞতা
মহাকাশ থেকে ভারতকে দেখা এক অনন্য অভিজ্ঞতা বলে জানিয়েছেন সুনীতা। তাঁর কথায়,
“যখনই হিমালয়ের উপর দিয়ে গিয়েছি, মনে হয়েছে পর্বতমালা যেন তরঙ্গ হয়ে ভারতে নেমে গিয়েছে। এত রঙের ছড়াছড়ি, এক অনন্য সৌন্দর্য। পূর্ব দিক থেকে গুজরাট বা মুম্বাইয়ের দিকে গেলে মাছ ধরার নৌকাও দেখা যেত, যদিও সেটা ছোট্ট একটা পাখির মতো মনে হতো। রাতের ভারত তো আরও অনন্য—বড় শহরগুলো আলোয় ঝলমলে, ধীরে ধীরে সেগুলো ছোট শহরে পরিণত হয়। দিন হোক বা রাত, সবসময়ই ভারতকে দেখতে অসাধারণ লাগে।”
তিনি আরও বলেন, “মহাকাশ থেকে ভারতকে দেখলে ‘সারে জাঁহা সে আচ্ছা’ বলেই মনে হয়।”
ভারত সফরের পরিকল্পনা ও প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণ
সুনীতা উইলিয়ামসের ভারত সফরের খবর প্রকাশ্যে আসার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁকে স্বাগত জানিয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। মোদি তাঁর চিঠিতে বলেন,
“ভারতীয় বংশোদ্ভূত হিসেবে আপনার সাফল্য আমাদের গর্বিত করে। আমরা অধীর আগ্রহে আপনার সফরের অপেক্ষায় রয়েছি। আপনার মহাকাশযাত্রার অভিজ্ঞতা আমাদের তরুণ প্রজন্মকে আরও অনুপ্রাণিত করবে।”
প্রধানমন্ত্রীর এই আমন্ত্রণে সুনীতা অভিভূত হয়েছেন এবং জানিয়েছেন, ভারতের মাটিতে এসে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার জন্য তিনি মুখিয়ে আছেন।
ভারতের মহাকাশ গবেষণায় সুনীতার ভূমিকা
সুনীতা উইলিয়ামস শুধু একজন নভোচারী নন, তিনি তরুণ বিজ্ঞানীদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ISRO বর্তমানে গগনযান মিশন-এর মতো একাধিক প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে। সুনীতার অভিজ্ঞতা, তাঁর ট্রেনিং এবং মহাকাশ স্টেশনে কাটানো দিনগুলোর অভিজ্ঞতা ভারতীয় নভোচারীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ISRO-এর চেয়ারম্যান এস. সোমনাথ বলেছেন,
“সুনীতা উইলিয়ামসের সফর আমাদের জন্য বড় সুযোগ। তিনি যেভাবে মহাকাশ গবেষণা ও মানুষের বসবাসযোগ্য স্পেস স্টেশন নিয়ে কাজ করেছেন, তা ভারতীয় নভোচারীদের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে দারুণ সাহায্য করবে।”
ভারতের জনগণের উচ্ছ্বাস
সুনীতা উইলিয়ামসের আগমন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। ভারতের তরুণ বিজ্ঞানীরা, মহাকাশপ্রেমীরা এবং শিক্ষার্থীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন তাঁকে কাছ থেকে শোনার জন্য। গুজরাটের ঝুলাসান গ্রাম, যেখানে তাঁর পৈতৃক ভিটে, সেখানেও উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। গ্রামের এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন,
“আমরা গর্বিত যে আমাদের গ্রামের মেয়ে মহাকাশ থেকে ফিরে আবার আমাদের মাটিতে আসছেন। আমরা চাই তিনি গ্রামে এসে শিশুদের সঙ্গে সময় কাটান, তাঁদের স্বপ্ন দেখাতে সাহায্য করেন।”
সুনীতা উইলিয়ামস: এক নজরে
- জন্ম: ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫, ওহাইও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
- বাবা: দীপক পাণ্ডে (গুজরাটের ঝুলাসান গ্রামের বাসিন্দা)
- মা: বনি পাণ্ডে
- পেশা: NASA-র নভোচারী
- মহাকাশ মিশন: STS-116, Expedition 14/15, Expedition 32/33
- মহাকাশে মোট সময়: ৩২২ দিন
- রেকর্ড: দ্বিতীয় ভারতীয় বংশোদ্ভূত মহিলা নভোচারী
ভবিষ্যতের প্রভাব
সুনীতা উইলিয়ামসের সফর শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত ভ্রমণ নয়, এটি ভারতের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে চলেছে। তরুণ বিজ্ঞানীদের অনুপ্রাণিত করার পাশাপাশি, তাঁর অভিজ্ঞতা গগনযান মিশন-এও কাজে লাগতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সুনীতার এই সফর ভারতের মহাকাশ গবেষণার প্রতি বিশ্ববাসীর আগ্রহ আরও বাড়াবে। পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে মহাকাশ গবেষণায় সহযোগিতার নতুন সুযোগও তৈরি হতে পারে। NASA এবং ISRO-র মধ্যকার সম্পর্ক আরও দৃঢ় হতে পারে, যা ভারতের ভবিষ্যৎ মহাকাশ প্রকল্পের জন্য দারুণ ইতিবাচক হবে।
উপসংহার
সুনীতা উইলিয়ামস শুধু একজন মহাকাশচারী নন, তিনি ভারতীয়দের জন্য এক অনুপ্রেরণা। শিকড়ের টানে ফিরে আসার এই যাত্রা শুধুমাত্র তাঁর নয়, এটি গোটা ভারতবাসীর গর্বের মুহূর্ত। মহাকাশে কাটানো অভিজ্ঞতা শেয়ার করে তিনি ভারতীয় তরুণদের নতুন স্বপ্ন দেখাবেন, ভবিষ্যতের নভোচারীদের তৈরি হতে সাহায্য করবেন। আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি তাঁর পদচিহ্নের জন্য, যা হয়তো ভারতের ভবিষ্যৎ মহাকাশ গবেষণার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।