‘Self-reliant’ India will send a station to space!:-ভারতের মহাকাশ অভিযান যেন এখন এক রোমাঞ্চকর গল্পের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে, আর সেই গল্পে আমরা প্রত্যেকে দর্শক হলেও গর্বের অংশীদারও বটে। শুক্রবার নয়াদিল্লিতে ইসরো যখন তাদের নতুন স্বপ্নের ঘোষণা করল—২০৩৫ সালের মধ্যেই ভারত পাবে নিজেদের মহাকাশ স্টেশন, তখন মনে হচ্ছিল একেবারে কোনো সায়েন্স ফিকশন সিনেমার দৃশ্য চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। নাম রাখা হয়েছে ‘ভারতীয় অন্তরীক্ষ স্টেশন’ বা বিএএস। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আগেই এই স্বপ্নের কথা বলেছিলেন, আর এবার সেই স্বপ্ন আরও স্পষ্ট আকার পেল। সহজ ভাষায় বললে, পৃথিবীকে ঘিরে মহাশূন্যে এক ভাসমান ঘর বানাচ্ছে ভারত, যেখানে বিজ্ঞানীরা থেকে যাবেন, গবেষণা করবেন, মহাকাশের অজানা রহস্য খুঁজবেন। শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটাই সত্যি। এ যেন নতুন যুগের সূচনা। আজ পর্যন্ত মহাকাশ স্টেশনের নাম শুনলেই ভেসে উঠত আমেরিকার ‘ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন’ আর চীনের ‘তিয়াংগং স্টেশন’-এর নাম। এবার সেই তালিকায় ভারতের নাম উঠতে চলেছে, আর এটাই ভারতের ‘আত্মনির্ভর’ হয়ে ওঠার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কিন্তু এই খবর শুধু মহাকাশ বিজ্ঞানীদের জন্য নয়, আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছেও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ।

প্রথমেই প্রশ্ন জাগে—এমন এক মহাকাশ স্টেশন কিসের জন্য দরকার? এর উত্তর খুঁজতে গেলে বুঝতে হবে, মহাকাশ স্টেশন শুধু বিজ্ঞানীদের খেলার জায়গা নয়, বরং এটি হলো ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জীবন ও প্রকৃতির পথপ্রদর্শক। ইসরো জানিয়েছে, এই মহাকাশ স্টেশন থেকে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে বোঝা যাবে অসমের ভয়ঙ্কর বন্যা আগেভাগে কোথায় কবে আসছে, কিংবা হিমালয়ের বরফ কত দ্রুত গলছে। অর্থাৎ প্রকৃতির অপ্রতিরোধ্য শক্তিকে আগে থেকে চিহ্নিত করে মানুষকে রক্ষা করার দায়িত্বও নেবে এই স্টেশন। কৃষকদের জন্যও এটি হবে আশীর্বাদ। আবহাওয়ার পরিবর্তন, বৃষ্টির পরিমাণ, মাটির জলীয়তা—এসব তথ্য আগেই জানা গেলে চাষবাস হবে আরও পরিকল্পিত, ফলন বাড়বে বহুগুণ। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে এ ধরনের তথ্য সংগ্রহই আগামী দিনের মানব সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখবে।প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা করেছেন, “ভারত শুধু মহাকাশ অভিযানে অংশ নিচ্ছে না, আমরা নেতৃত্ব দিচ্ছি। আজ আত্মনির্ভর ভারতের স্বপ্ন শুধু পৃথিবীর জন্য নয়, মহাকাশের জন্যও।” তাঁর এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক অদম্য আত্মবিশ্বাস। মোদির এই বার্তা স্পষ্ট করে দিল যে ভারত আর অন্য কারও ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং মহাকাশ অভিযানে নিজের অবস্থান তৈরি করছে।
ইসরোর চেয়ারম্যান এস. সোমনাথ শুক্রবার সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, “এই প্রকল্পের কাজ অত্যন্ত কঠিন হলেও আমরা আত্মবিশ্বাসী। ভারতীয় বিজ্ঞানীরা আজ যে প্রযুক্তি তৈরি করেছেন, তাতে ২০৩৫ সালের মধ্যে মহাকাশ স্টেশন আমাদের নাগালের মধ্যেই।” তাঁর চোখেমুখে যে উচ্ছ্বাস ছিল, তা গোটা দেশকেই অনুপ্রাণিত করেছে।এই ঘোষণার পরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের প্রতিক্রিয়া ছিল অভূতপূর্ব। কলকাতার এক স্কুলশিক্ষক বলছিলেন, “আমাদের বাচ্চারা যখন বড় হবে, তখন তারা ভারতীয় মহাকাশ স্টেশনের খবর পড়ে বড় হবে। এ এক বিশাল অনুপ্রেরণা।” অন্যদিকে, আসামের এক মৎস্যজীবী বললেন, “প্রতি বছর আমাদের জীবন বন্যায় ভেসে যায়। যদি সত্যিই এই স্টেশন থেকে আগাম সতর্কতা মেলে, তবে আমাদের জীবনে নতুন আশা জাগবে।”আন্তর্জাতিক মহলেও ভারতের এই পদক্ষেপ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমেরিকা, রাশিয়া, চীন এতদিন মহাকাশ প্রযুক্তিতে অগ্রগণ্য ছিল, এবার ভারত সেই তালিকায় দৃঢ়ভাবে নিজের নাম লেখাচ্ছে। এর ফলে ভারতের মহাকাশ গবেষণায় বিদেশি বিনিয়োগ আসবে, বাড়বে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, আর নতুন করে খুলবে বৈশ্বিক চাকরির দরজা।

তবে চ্যালেঞ্জও কম নেই। মহাকাশ স্টেশন বানানো কোনো ছোট ব্যাপার নয়। বিরাট অর্থ বিনিয়োগ, সুদূরপ্রসারী প্রযুক্তি, আর হাজার হাজার বিজ্ঞানীর অমানুষিক পরিশ্রম লাগবে। কিন্তু ইসরোর পূর্ব ইতিহাস আমাদের শেখায়, তারা অসম্ভবকে সম্ভব করতে জানে। চন্দ্রযান, মঙ্গলযান, আদিত্য-L1—সবকিছুই যেন ভারতকে প্রতিবার নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। তাই মহাকাশ স্টেশনও একদিন ভারতীয়দের গর্ব হবে, এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই।ভারতীয় তরুণ প্রজন্মের কাছে এই খবর নতুন স্বপ্নের মতো। অনেক ছাত্রছাত্রীই এখন বলছে, তারা বড় হয়ে মহাকাশ গবেষক হতে চায়। আসলে এই ঘোষণাই তাদের মনে নতুন এক প্রেরণা জাগিয়েছে। কেউ বলছে, “আমরা যখন মহাকাশের ভাসমান ঘরে ভারতীয় পতাকা উড়তে দেখব, তখন সত্যিই মনে হবে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।”এই ঘটনার সামাজিক প্রভাবও ব্যাপক। গ্রামে, শহরে, এমনকি চা-দোকানের আড্ডায়ও এখন একটাই আলোচনা—ভারত মহাকাশ স্টেশন বানাচ্ছে! সাধারণ মানুষও বুঝতে শুরু করেছে, বিজ্ঞান কেবল গবেষণাগারে আটকে নেই, এটি সরাসরি আমাদের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত। এই উপলব্ধিই আসলে ভারতের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।শেষমেষ বলতে হয়, মহাকাশ স্টেশনের এই স্বপ্ন কেবল প্রযুক্তিগত উন্নতি নয়, এটি ভারতের আত্মবিশ্বাস, সংগ্রাম, আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতীক। যেভাবে স্বাধীনতার পরে ভারত ধীরে ধীরে দাঁড়িয়েছে, আজকের এই ঘোষণাও সেই দীর্ঘ যাত্রার এক নতুন অধ্যায়। ২০৩৫ সালে যখন ভারতীয় মহাকাশ স্টেশনে পতাকা উড়বে, তখন হয়তো আমরা সবাই গর্ব করে বলব—হ্যাঁ, এটাই আমাদের ভারত, আত্মনির্ভর ভারত।