Russia stands by India to counter America’s blinders : আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও জ্বালানি বাজারের টানাপোড়েন আজকের বিশ্বরাজনীতির অন্যতম বড় দিক। বিশেষত রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই তেলের বাজারে বিপুল অস্থিরতা দেখা দেয়। পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার উপর নানা রকম নিষেধাজ্ঞা চাপায়। এর ফলে রাশিয়ান তেলের বাজার অনেকটা সংকুচিত হয়। ঠিক সেই সময় ভারতের মতো বড় ক্রেতা দেশ রাশিয়ার পাশে দাঁড়ায়। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ ভারত, নিজের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে রাশিয়া থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অপরিশোধিত তেল কেনা শুরু করে। এতে পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে আমেরিকা, একাধিকবার অসন্তোষ প্রকাশ করে।
সাম্প্রতিক ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের তীব্র চাপ ও শুল্ক বৃদ্ধিকে উপেক্ষা করে ভারত আবারও রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ তেল আমদানির বরাত দিয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের জন্য ভারতের দুটি বড় তেল শোধন সংস্থা রাশিয়ার উরালস তেল আমদানির চুক্তি করেছে।সূত্র অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে রাশিয়ান তেলের উপর ছাড়ের পরিমাণ কমে গিয়েছিল। ফলে বাজারে জল্পনা তৈরি হয়েছিল যে ভারত হয়তো ধীরে ধীরে রাশিয়ান তেল কেনা কমিয়ে দেবে। রয়টার্সের প্রতিবেদনেও এমন অনুমান প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু পরিস্থিতি বদলায় হঠাৎই। সম্প্রতি রাশিয়া আবারও ব্যারেলপ্রতি প্রায় তিন ডলার ছাড় ঘোষণা করে। এই ছাড় কার্যত পাঁচ শতাংশের সমান। এত বড় সাশ্রয় ভারতের জন্য ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, প্রতিদিন ভারত লক্ষ লক্ষ ব্যারেল তেল আমদানি করে থাকে। তাই ব্যারেলপ্রতি তিন ডলার ছাড় মানে শেষ পর্যন্ত দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার থেকে কোটি কোটি ডলার সাশ্রয়।

আশ্চর্যের বিষয়, এই ব্যাপারে ভারত কিংবা রাশিয়া—কোনও পক্ষই সরকারিভাবে কিছু জানায়নি। সরকারের তরফে কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি না আসলেও, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ। ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য যেকোনও সুযোগকে কাজে লাগানোই সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য।দেশের সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে, এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেই ভারতে সরাসরি প্রভাব পড়ে পেট্রোল, ডিজেল ও রান্নার গ্যাসের দামে। ফলে সাধারণ খরচের উপর তার চাপ পড়ে। তাই তেল কেনার ক্ষেত্রে যত বেশি ছাড় মিলবে, দেশের ভোক্তাদের জন্য ততটাই মঙ্গল। অর্থনীতিবিদরাও বলছেন, এই ছাড় দীর্ঘমেয়াদে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতেও সাহায্য করতে পারে।

আমেরিকার চাপ এবং অতিরিক্ত শুল্ক সত্ত্বেও ভারত কেন রাশিয়ান তেল আমদানি বাড়াচ্ছে, তার মূল কারণ অর্থনৈতিক লাভ। ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের উপর ইতিমধ্যেই ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছে। এরপর রাশিয়ান তেল কেনার ‘অপরাধে’ আরও ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপানো হয়। তবুও ভারত সিদ্ধান্তে অনড় থাকে। এর পেছনে দুটি বড় যুক্তি আছে
প্রথমত, ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশে শিল্পোন্নয়ন ও দৈনন্দিন জীবনের জন্য জ্বালানি অপরিহার্য। তাই তেল আমদানির ক্ষেত্রে বিকল্প বাজার খোঁজা ভারতের জন্য একেবারেই সহজ নয়।
দ্বিতীয়ত, রাশিয়া ভারতের জন্য স্থায়ীভাবে একটি নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী। পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ান তেল বিশ্ববাজারে তুলনামূলকভাবে সস্তায় পাওয়া যায়। তাই ভারতের জন্য এটি কৌশলগত সুবিধা।

আগামী দিনে এই চুক্তি ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের উপর কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে জল্পনা বাড়ছে। মার্কিন প্রশাসন হয়তো আরও চাপ সৃষ্টি করবে, আবার ভারতের কূটনীতিও তার পাল্টা কৌশল তৈরি রাখবে।তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে ভারত তার জ্বালানি আমদানির উৎসকে বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করবে। সৌদি আরব, ইরাকের মতো প্রচলিত উৎসের পাশাপাশি রাশিয়ার সস্তা তেলও ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধান।

রাশিয়ান তেল নিয়ে ভারত-আমেরিকা টানাপোড়েন নতুন কিছু নয়। তবে এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হলো, নয়া দিল্লী কেবল চাপের কাছে মাথা নোয়াতে রাজি নয়। দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও সাধারণ মানুষের স্বস্তি যেখানে প্রশ্নে আসে, সেখানে ভারত নিজের পথেই চলবে। রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার সিদ্ধান্ত তারই স্পষ্ট দৃষ্টান্ত।