Reduce screen time to maintain eyesight : চোখ—মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। আমরা পৃথিবী দেখি, রঙ চিনি, মানুষের হাসি বা দুঃখ অনুভব করি—সবটাই এই ছোট অথচ অসাধারণ অঙ্গটির জন্যই সম্ভব। চিকিৎসকেরা বারবার বলেন, চোখ শুধু দেহের জানালা নয়, এটি আমাদের ব্যক্তিত্ব ও আত্মবিশ্বাসেরও প্রতিচ্ছবি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উদ্বেগজনক একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—ভারতের কমবয়সিদের মধ্যে দৃষ্টিশক্তি হারানোর হার বাড়ছে। যে সমস্যাকে আগে প্রায় একচেটিয়াভাবে বয়স্কদের রোগ বলে ধরা হতো, তা এখন ৩০ বছরের কম বয়সিদেরও আক্রমণ করছে। আর এর অন্যতম প্রধান কারণ—অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম।
প্রযুক্তির যুগে মোবাইল, ল্যাপটপ, টেলিভিশন, ট্যাব—সবই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্মক্ষেত্র থেকে বিনোদন, খবর থেকে সামাজিক যোগাযোগ—সবই এখন স্ক্রিন নির্ভর। মোবাইল ফোন তো এখন শুধুমাত্র ফোন নয়, এটি যেন ব্যক্তিগত সহকারী, বিনোদন কেন্দ্র, অফিস এবং বাজার—সব একসাথে। তবে এই সুবিধার পেছনে লুকিয়ে আছে বড় বিপদ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা চোখের উপর প্রচণ্ড চাপ ফেলে। এর ফলে চোখ শুকিয়ে যায়, কর্নিয়ায় ক্ষতি হয়, এবং দীর্ঘমেয়াদে দৃষ্টিশক্তি কমতে থাকে। ভারতে বিশেষ করে কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে অন্ধত্বের ঘটনা বাড়ছে। আগেকার দিনে এই সমস্যা মূলত বয়স্কদের মধ্যে দেখা যেত, কিন্তু এখন ২০ থেকে ৩০ বছরের যুবসমাজও এর শিকার হচ্ছে।

যদিও সরাসরি এই সমস্যার জন্য বড় সরকারি প্রকল্প এখনো ঘোষণা হয়নি, তবুও স্বাস্থ্য মন্ত্রকের পক্ষ থেকে জনসচেতনতা বাড়াতে নানা প্রচারাভিযান চালানো হচ্ছে। বিভিন্ন রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তর স্কুল ও কলেজে চোখের স্বাস্থ্য পরীক্ষা শিবির আয়োজন করছে। চিকিৎসকেরা নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছেন—প্রতিদিন অন্তত ২০-২০-২০ নিয়ম মেনে চলতে, অর্থাৎ প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিন ব্যবহারের পর ২০ ফুট দূরের কোনও জিনিস ২০ সেকেন্ড ধরে দেখা। এছাড়াও, অযথা ফোনে সময় নষ্ট না করে প্রয়োজন অনুযায়ী ডিভাইস ব্যবহার করার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

কথা বলেছিলাম কলকাতার একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করা ২৬ বছর বয়সী সুদীপ ঘোষের সঙ্গে। তিনি জানান, “অফিসের কাজ সারাদিন কম্পিউটারে করতে হয়, তারপরে বাড়ি ফিরে আবার ফোনে খবর দেখি বা সিরিজ দেখি। কয়েক মাস ধরে চোখে ঝাপসা দেখছি, পরে ডাক্তার জানালেন কর্নিয়ায় সমস্যা হয়েছে।” একই অভিজ্ঞতা ভাগ করেছেন কলেজছাত্রী তৃষা সাহাও—”অনলাইন ক্লাস আর সোশ্যাল মিডিয়া মিলে ফোন ছাড়া থাকা যায় না, কিন্তু এখন বুঝছি নিজের চোখের জন্যই সীমা টানা দরকার।” এই অভিজ্ঞতাগুলোই প্রমাণ করে সমস্যাটি কতটা গভীরভাবে জীবনের সাথে মিশে গেছে।

চোখের কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পেছনে শুধু স্ক্রিন টাইম নয়, আরও কিছু কারণ আছে—যেমন ধুলোবালি, দূষণ, সংক্রমণ, বা কর্মক্ষেত্রে শারীরিক আঘাত। গ্রামীণ এলাকায় কৃষিকাজ বা কারখানায় কাজ করা অনেকের কর্নিয়ায় চোট লাগার ঘটনা ঘটছে। তবে সমস্যাটি আরও গুরুতর হয় যখন আক্রান্তরা চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে নিজে নিজে ঘরোয়া উপায়ে সমাধানের চেষ্টা করেন। এতে সাময়িক আরাম মিললেও আসল রোগ আরও গভীরে পৌঁছে যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দৃষ্টিশক্তি হারানোর ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রেই সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে তা প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই সচেতনতা বাড়ানোই সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনে প্রযুক্তি নির্ভরতা আরও বাড়বে, তাই চোখের সুরক্ষার জন্য এখনই অভ্যাস বদলানো জরুরি। অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্ক্রিন টাইম কমানোর নীতি প্রয়োগ, জনসচেতনতা কর্মসূচি বাড়ানো এবং সুলভ চক্ষু-পরীক্ষা সেবা নিশ্চিত করাই এই সমস্যা মোকাবিলার পথ। পাশাপাশি, প্রতিদিন অন্তত আধঘণ্টা প্রকৃতির মাঝে হাঁটা, পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত চোখের ব্যায়াম—এসব ছোট ছোট পদক্ষেপও দীর্ঘমেয়াদে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
চোখ আমাদের জীবনের জানালা। প্রযুক্তির যুগে স্ক্রিন আমাদের জীবনকে সহজ করছে, কিন্তু একই সাথে চোখের উপর বাড়তি চাপও ফেলছে। এই চাপ কমানো, সঠিক যত্ন নেওয়া এবং নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করানো এখন শুধু ব্যক্তিগত অভ্যাস নয়, জীবনযাত্রার অংশ হয়ে ওঠা উচিত। কারণ, একবার দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে গেলে তা ফেরানো অনেক সময় অসম্ভব হয়ে যায়। তাই এখন থেকেই সচেতন হোন—আপনার চোখ বাঁচান, আপনার দৃষ্টি রক্ষা করুন।