Plan to hit China with rice to ‘punish’ Russian oil imports : ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও কূটনীতির মানচিত্র বদলে যাচ্ছে দ্রুত। পশ্চিমা দেশগুলির আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ভারত ও চিন—দুই বৃহৎ অর্থনীতি—রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে। পশ্চিমের চোখে এটি যেন রাশিয়ার যুদ্ধযন্ত্রে আর্থিক অক্সিজেন জোগানোর সমান। সেই কারণেই মার্কিন প্রশাসন বারবার সতর্ক করেছে দিল্লি ও বেজিং-কে। এর মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের উপর অতিরিক্ত শুল্ক চাপানোর ঘোষণা করেন, আর এবার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মন্তব্যে স্পষ্ট হয়ে গেল—চিনও একই ধরনের শাস্তির মুখে পড়তে চলেছে।
ঘটনার বিবরণ
গত বুধবার ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, রাশিয়া থেকে ভারত তেল আমদানি চালিয়ে যাওয়ায় ভারতীয় পণ্যের উপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক বসানো হবে। এর ফলে মোট আমদানি শুল্ক দাঁড়াবে ৫০ শতাংশে। ট্রাম্প স্বাক্ষরিত এক্সিকিউটিভ অর্ডার অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে ২১ দিন পরে। তাঁর বক্তব্য, ভারত মার্কিন সতর্কবার্তা উপেক্ষা করছে এবং সেই কারণেই ‘শাস্তিমূলক কর’ বসানো হচ্ছে।
এর পরপরই ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সংবাদমাধ্যমে জানান, শুধু ভারত নয়, রুশ তেল কেনার জন্য শি জিনপিংয়ের দেশকেও একই পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। তিনি ইঙ্গিত দেন, চিনের উপরও শীঘ্রই বাড়তি বাণিজ্যিক চাপ সৃষ্টি করবে ওয়াশিংটন।
ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই সোশাল মিডিয়ায় ট্রাম্প লেখেন—“সয়াবিনের অভাব নিয়ে চিন চিন্তিত। তবে আমাদের চাষিরা খুব ভাল সয়াবিন উৎপাদন করেন। আশা করব, চিন দ্রুত সয়াবিনের অর্ডার চার গুণ বাড়িয়ে দেবে।” এই বক্তব্য ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে জল্পনা শুরু হয়েছে—চিনকে শাস্তি দিতে কি সয়াবিন আমদানিকে কূটনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে আমেরিকা?
সরকারি প্রতিক্রিয়া
ভারতের পক্ষ থেকে ট্রাম্পের এই শুল্কবৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে—“অন্য বহু দেশ নিজেদের জাতীয় স্বার্থের কথা ভেবে রুশ তেল আমদানি করছে। শুধু ভারতকে আলাদা করে টার্গেট করা অন্যায্য।”
চিনের তরফে যদিও এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসেনি। তবে বেজিংয়ের নীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের সয়াবিন মন্তব্যই স্পষ্ট সংকেত—শুল্ক বা পণ্যের সরবরাহকে হাতিয়ার করে বাণিজ্যিক চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে ওয়াশিংটন।
স্থানীয় মতামত
আমেরিকার কৃষিক্ষেত্রে সয়াবিন অন্যতম রপ্তানিমুখী পণ্য। মধ্য-পশ্চিমের চাষিরা ট্রাম্পের মন্তব্যে স্বাভাবিকভাবেই উৎসাহিত হয়েছেন। তাদের আশা, চিন যদি সত্যিই অর্ডার চারগুণ বাড়ায়, তবে স্থানীয় বাজারে সয়াবিনের দাম বাড়বে এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাবে।
অন্যদিকে, চিনের আমদানিকারক ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে এক ধরনের অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। আমেরিকা থেকে সয়াবিনের সরবরাহ কমে গেলে বিকল্প উৎস থেকে আমদানি করতে হবে, যা ব্যয়বহুল হতে পারে।
বিশ্লেষণ
মার্কিন-চিন সম্পর্ক আগেও বাণিজ্যযুদ্ধে উত্তপ্ত হয়েছে। ট্রাম্পের প্রথম প্রেসিডেন্ট মেয়াদেই একাধিক পণ্যে শুল্কবৃদ্ধি হয়েছিল, যার ফলে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। এবার রুশ তেল আমদানিকে কেন্দ্র করে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
ভারত ও চিন উভয়েই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শক্তি ও অর্থনীতি। এই দুই দেশের উপর একযোগে বাণিজ্যিক চাপ সৃষ্টি করলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল, জ্বালানি বাজার ও কৃষিপণ্যের দামে বড়সড় প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষত, সয়াবিনের মতো কৌশলগত কৃষিপণ্যকে ‘শাস্তির হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করলে খাদ্যশস্য বাজারেও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি
আগামী কয়েক সপ্তাহই নির্ধারণ করবে—আমেরিকা সত্যিই চিনের উপর ভারতের মতোই উচ্চ শুল্ক আরোপ করবে কিনা, নাকি সয়াবিন আমদানির মতো নির্দিষ্ট পণ্যে চাপ সৃষ্টি করবে। যদি ওয়াশিংটন এ পথে হাঁটে, তবে তা শুধু বাণিজ্য সম্পর্কেই নয়, কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলবে।
চিন হয়তো বিকল্প সয়াবিন সরবরাহকারী দেশ যেমন ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার দিকে ঝুঁকতে পারে। ভারতও এই পরিস্থিতিতে নতুন বাজার ও কূটনৈতিক সমর্থন খুঁজবে।
উপসংহার
রুশ তেল কেনা ঘিরে আমেরিকার ‘শাস্তিমূলক করনীতি’ এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রে। ভারতকে ৫০ শতাংশ শুল্ক দিয়ে আমেরিকায় পণ্য রপ্তানি করতে হবে, আর চিনও হয়তো একই ভাগ্য বরণ করতে চলেছে। সয়াবিন মন্তব্যের মাধ্যমে ট্রাম্প যে সংকেত দিয়েছেন, তা স্পষ্ট—বাণিজ্যিক চাপ ও কৃষিপণ্যকে সমান্তরালভাবে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে নতজানু করার কৌশলই এখন ওয়াশিংটনের হাতে প্রধান অস্ত্র। আগামী দিনেই বোঝা যাবে, এই কৌশল কতটা কার্যকর হয়, আর তার প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী হবে।