Pale complexion—warning sign of low hemoglobin : আজকের দিনে আমাদের চারপাশে যতই তাকানো যাক না কেন, মানুষজনের মধ্যে এক ধরনের অজানা ক্লান্তি, মুখে ফ্যাকাশে ভাব, সামান্য হাঁটা বা সিঁড়ি ভাঙলেই শ্বাসকষ্ট দেখা দিচ্ছে। হয়তো আমরা ভেবেই নিচ্ছি—“শুধু কাজের চাপ, বিশ্রামের অভাব বলেই হচ্ছে।” কিন্তু ডাক্তাররা সতর্ক করছেন, এর পিছনে লুকিয়ে থাকতে পারে শরীরে হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি। হিমোগ্লোবিন হলো রক্তের মধ্যে উপস্থিত এক বিশেষ প্রোটিন, যা লোহিত রক্তকণিকার (RBC) ভিতরে থাকে এবং এর প্রধান কাজ হলো অক্সিজেন শরীরের প্রতিটি কোষে পৌঁছে দেওয়া। সহজ ভাষায় বলা যায়, আমাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গ, প্রতিটি কোষ সঠিকভাবে কাজ করছে শুধু এই হিমোগ্লোবিনের জন্যই। অথচ আজ বাংলার গ্রাম-শহর মিলিয়ে অসংখ্য মানুষ এই রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়ার সমস্যায় ভুগছেন, বিশেষত মহিলারা ও শিশুরা।
পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে দেখা যাচ্ছে, অনেক গৃহবধূ বা কিশোরী মেয়ে সকালে সামান্য কাজ করেই হাঁপিয়ে উঠছেন। পূর্ব মেদিনীপুরের এক কিশোরী বলছিল, “দিদি, সামান্য সিঁড়ি ভাঙলেই মাথা ঘুরে যায়, মনে হয় দাঁড়িয়েই ঘুমিয়ে পড়ব।” কলকাতার নামকরা চিকিৎসক ডা. সৌরভ ভট্টাচার্য বলেন, “হিমোগ্লোবিন কমে গেলে শরীর পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না। এর ফলে ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, ঝিমুনি, ঠান্ডা ঠান্ডা লাগা, চুল-নখ ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া ইত্যাদি লক্ষণ দেখা যায়। এটা অবহেলা করার মতো বিষয় নয়।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমোগ্লোবিনের মাত্রা নিশ্চিতভাবে জানতে হলে রক্ত পরীক্ষা করানো জরুরি। সাধারণত পুরুষদের জন্য ১৩-১৭ গ্রাম/ডেসিলিটার ও মহিলাদের জন্য ১২-১৫ গ্রাম/ডেসিলিটার হিমোগ্লোবিন স্বাভাবিক ধরা হয়। শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রেও এর ভিন্ন ভিন্ন মান আছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, মহিলাদের হিমোগ্লোবিন ৯ বা ৮-এর নিচে নেমে যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ভারতবর্ষে প্রায় ৫০ শতাংশ মহিলা এবং ৪০ শতাংশ শিশু অ্যানিমিয়ায় আক্রান্ত। পশ্চিমবঙ্গও এর বাইরে নয়।
এখন প্রশ্ন হলো—কেন এত মানুষ হিমোগ্লোবিনের ঘাটতিতে ভুগছেন? বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, খাবারে পর্যাপ্ত লোহা (Iron) ও ভিটামিন না থাকার কারণেই এই সমস্যা বেশি। দারিদ্র্য, অজ্ঞতা, অপুষ্টি—সব মিলিয়ে বাংলার বহু পরিবারেই খাবারে পালং শাক, বিট, কলিজা, ডাল, ছোলা, তিল বা শুকনো ফল নিয়মিত থাকে না। অনেকেই আবার জানেনই না যে ভিটামিন সি আয়রন শোষণে সাহায্য করে, ফলে লেবু, কমলা, পেয়ারা, টমেটো খাওয়ার গুরুত্বও বোঝেন না। অপরদিকে, খাবারের পরপরই চা-কফি খাওয়ার অভ্যাস আয়রন শোষণকে বাধাগ্রস্ত করে।
এই সমস্যার সামাজিক প্রভাবও কম নয়। অ্যানিমিয়ায় আক্রান্ত কিশোরীরা স্কুলে গিয়ে মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন না, দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়েন। গ্রামীণ মহিলারা মাঠে বা সংসারের কাজে পুরোপুরি সক্ষম থাকেন না। এতে উৎপাদনশীলতা কমে যায়, অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। এমনকি গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে হিমোগ্লোবিন কম থাকলে মা ও শিশুর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে। এক গর্ভবতী মা বলছিলেন, “ডাক্তার আমাকে বলেছেন, যদি এখন রক্ত না বাড়াই, প্রসবের সময় বিপদ হতে পারে।”
অ্যানিমিয়া শুধু ব্যক্তির সমস্যা নয়, এটি এখন এক সামাজিক সংকট হয়ে উঠছে। চিকিৎসকরা বলছেন, “এই সমস্যা অবহেলা করলে দীর্ঘমেয়াদে হার্ট, কিডনি এমনকি মস্তিষ্কও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।” তাই এখনই পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। সরকারও বিভিন্ন স্তরে আয়রন ট্যাবলেট বিতরণ করছে, স্কুলে মিড-ডে মিলের মাধ্যমে পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু সচেতনতা তৈরি করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এই স্বাস্থ্য সংকটের মধ্যে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ছায়াও ভেসে উঠছে। বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া নতুন ঘূর্ণাবর্তের কারণে রাজ্যে ইতিমধ্যেই ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, আগামী কয়েকদিন উপকূলবর্তী জেলাগুলোতে প্রবল বৃষ্টি হবে। সমুদ্রে জেলেদের যেতে মানা করা হয়েছে। পূর্ব মেদিনীপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনার মতো এলাকায় মানুষের মধ্যে ভয় ও উৎকণ্ঠা বাড়ছে। “আমরা তো প্রতিদিন মাছ ধরতে যাই, কিন্তু সমুদ্রে যেতে এখন ভয় লাগছে,” জানালেন এক জেলে। অর্থাৎ, একদিকে মানুষ অ্যানিমিয়ায় ভুগছেন, অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাদের জীবনে নতুন চাপ আনছে।
এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন—“খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনুন। আয়রন ও ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার প্রতিদিনের তালিকায় রাখুন। আর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন।” সমাজকর্মীরা জানাচ্ছেন, “আমরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে মেয়েদের বোঝাচ্ছি, শুধু ভাত আর আলুভাজা খেলে চলবে না। খাবারের থালায় শাক-সবজি, ডাল, গুড়, লেবু রাখতে হবে।”
আজকের খবর তাই আমাদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। ক্লান্তি, দুর্বলতা, ফ্যাকাশে চেহারাকে হেলাফেলা করবেন না। এগুলো হয়তো শরীরের ভেতরের বড় সংকেত। সময় থাকতে যদি ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তাহলে পরিবার, সমাজ, এমনকি গোটা রাজ্যকেই আরও সুস্থ করে তোলা সম্ভব। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে লড়াই করার মতো শক্তি গড়ে তুলতে হলে আগে নিজেদের শরীরকে সুস্থ রাখতে হবে।