Thursday, August 28, 2025
Google search engine
Homeঅন্যান্যআবহাওয়াইরাবতীর জলে ডুবল পাকিস্তান

ইরাবতীর জলে ডুবল পাকিস্তান

Pakistan submerged in the waters of the Irrawaddy : একনাগাড়ে টানা বর্ষণের জেরে পাকিস্তানের উপর যেন আছড়ে পড়েছে প্রকৃতির রুদ্ররূপ, আর তারই সবচেয়ে ভয়াবহ সাক্ষী হয়ে উঠেছে ইরাবতী নদী। একদিকে প্রবল বৃষ্টির জেরে পাকিস্তানের সাগর বাঁধে জমে যায় বিপুল পরিমাণ জল, আর সেই চাপ সহ্য করতে না পেরে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত জল ছেড়ে দেয়। ফলত, সেই জল একপ্রকার তাণ্ডবের রূপ নেয়। সীমান্তবর্তী অঞ্চল প্লাবিত হয়, নদীর জল ধেয়ে যায় কর্তারপুর সাহিব গুরুদ্বারের দিকে। শিখদের কাছে পৃথিবীর অন্যতম পবিত্র এই গুরুদ্বার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় সম্পূর্ণ ডুবে যায়। গুরুদ্বারের লঙ্গর হল, সরোবর, পরিক্রমা—সবই জলমগ্ন হয়ে পড়ে। জলস্তর এমন জায়গায় পৌঁছয় যে, ৫ থেকে ৭ ফুট পর্যন্ত গভীর জলে ঢেকে যায় এই পুণ্যস্থল। স্থানীয় শিখ সম্প্রদায়ের মানুষের কণ্ঠে তাই শুধু অসহায় আর্তি—“এ দৃশ্য আমরা কখনও ভাবিনি।” পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমে এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “আমাদের গুরুদ্বার শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটা আমাদের প্রাণ। কিন্তু এখন কেবল জলে ভাসছে ইতিহাস।”

পরিসংখ্যান বলছে, এবারের ভয়াবহ বর্ষণে ইতিমধ্যেই প্রায় ৪০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে পাকিস্তানে। হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন। গ্রাম থেকে শহর, প্রত্যেক জায়গায় জল ঢুকে পড়েছে। সীমান্তবর্তী পাঞ্জাব প্রদেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। বিশেষত কর্তারপুর সাহিব গুরুদ্বার ডুবে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে শিখ সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রবল ক্ষোভ ও দুঃখ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকে সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করছেন তাঁদের অশ্রুসিক্ত অনুভূতি। কানাডা থেকে এক শিখ প্রবাসী লিখেছেন—“কর্তারপুর আমাদের আত্মার সঙ্গে জড়িয়ে, আজ সেটি জলে ডুবে যেতে দেখা আমাদের কাছে বুক ফাটার মতো।”

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে ধুসি বাঁধ। ইরাবতী নদীর জল ধুসি বাঁধের উপর দিয়ে বইতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যেই বাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের আশঙ্কা, যদি বাঁধ ভেঙে যায়, তবে আরও কয়েকশো গ্রাম মুহূর্তের মধ্যে জলের নীচে চলে যাবে। ভারত-পাক সীমান্তের জিরো লাইনও এখন জলের তলায়। সীমান্তরক্ষী বাহিনী একাধিক এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সীমান্ত থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে কর্তারপুর গুরুদ্বার অবস্থিত, ফলে ভারতের পক্ষ থেকেও নজর রাখা হচ্ছে পরিস্থিতির দিকে।

untitled design 17 4

ইতিহাস বলছে, শেষবার এত বড় বন্যা হয়েছিল ২০২৩ সালে। কিন্তু সেবার পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হয়নি। এবারের বন্যার তীব্রতা তুলনাহীন। পাকিস্তানের প্রশাসন মেনে নিয়েছে, এটি এক ভয়ঙ্কর মানবিক বিপর্যয়। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ইতিমধ্যেই জরুরি বৈঠক ডেকেছেন এবং আন্তর্জাতিক সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, “এটি শুধু পাকিস্তানের নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য সংকট। আমরা চাই সবাই আমাদের পাশে দাঁড়াক।”

এই পরিস্থিতির প্রভাব সীমান্তের ভারতীয় এলাকাতেও পড়েছে। শিখ ধর্মাবলম্বীদের জন্য কর্তারপুর করিডোর কয়েক বছর আগে খুলে দেওয়া হয়েছিল যাতে তাঁরা ভিসা ছাড়াই গুরুদ্বারে দর্শন করতে পারেন। কিন্তু নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারত সরকার আগেই এই করিডোর বন্ধ করে দিয়েছিল। এখন বন্যার জেরে সেই করিডোর আরও অচল হয়ে গেছে। ফলে ভারতীয় শিখদের জন্য কর্তারপুর দর্শন যেন আরও দূর স্বপ্ন হয়ে গেল। অনেকে বলছেন, “যখনই মনে হয় গুরুদ্বার দেখতে যাব, তখনই নতুন বাধা এসে দাঁড়ায়।”

অন্যদিকে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাকিস্তানের এই দুরবস্থা আসলে জলবায়ু পরিবর্তনের একটি ভয়ঙ্কর ইঙ্গিত। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, বাঁধের দুর্বল অবস্থা এবং নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের ব্যর্থতা—সব মিলিয়ে এক মারাত্মক সংকট তৈরি হয়েছে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিশেষজ্ঞের মতে, “পাকিস্তান, ভারত কিংবা বাংলাদেশ—আমরা কেউই আলাদা নই। জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের সবার ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে যদি এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়।”

অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই বন্যার প্রভাব ভয়াবহ হবে। কৃষিজমি তলিয়ে গেছে, ফসল নষ্ট হয়েছে। পাকিস্তান য ohnehin অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে নতুন এই দুর্যোগ যেন আগুনে ঘি ঢালার মতো। হাজার হাজার পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছে। অনেকে ভেসে যাওয়া বাড়িঘরের সামনে দাঁড়িয়ে হাহাকার করছেন—“আমাদের সবকিছু শেষ হয়ে গেল।” শিশুদের নিয়ে উদ্বিগ্ন মায়েরা, বয়স্কদের অসহায় চাহনি, গবাদি পশুর মৃত্যুর আর্তনাদ—সব মিলিয়ে চরম এক মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি আমাদেরও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, প্রকৃতি যখন রুদ্ররূপ ধারণ করে তখন সীমান্ত, ধর্ম বা রাজনীতি কোনও কিছুরই মানে থাকে না। আজ পাকিস্তানের শিখ গুরুদ্বার জলে ভেসে যাচ্ছে, কাল একই ঘটনা ঘটতে পারে ভারতের কোনও পবিত্র স্থানে। জলবায়ু পরিবর্তন, বাঁধের দুর্বলতা আর সরকারের অদূরদর্শিতা—সব মিলিয়েই আজকের এই ভয়াবহ চিত্র। কর্তারপুর গুরুদ্বার শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি আমাদের যৌথ ইতিহাসের প্রতীক। তার এভাবে প্লাবিত হওয়া আসলে গোটা উপমহাদেশের ব্যথা।

এখন প্রশ্ন থেকে যায়—কখন এই পরিস্থিতির উন্নতি হবে? আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, আরও কয়েকদিন বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। অর্থাৎ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। হাজার হাজার মানুষ ইতিমধ্যেই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে উদ্বাস্তু শিবিরে ঠাঁই নিয়েছেন। আন্তর্জাতিক সমাজ কি এবার পাকিস্তানের পাশে দাঁড়াবে? ভারত কি সীমান্তবর্তী এলাকায় মানবিক সহায়তার হাত বাড়াবে?

একইসঙ্গে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও এর গভীর প্রভাব রয়েছে। শিখ ধর্মাবলম্বীরা কর্তারপুর সাহিবকে তাঁদের গুরু নানকের শেষ জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে দেখেন। গুরু নানক এখানেই তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলি কাটিয়েছিলেন। তাই গুরুদ্বারটির গুরুত্ব অপরিসীম। আজ সেটি যখন জলের তলায়, তখন তা যেন গোটা শিখ সম্প্রদায়ের মনে এক গভীর ক্ষত হয়ে রইল।

এই দুর্যোগ আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে—মানুষ প্রকৃতির সামনে আসলে অসহায়। আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নয়ন, রাজনীতি সবই অর্থহীন হয়ে পড়ে যখন একফোঁটা জল একসাথে পাহাড়সম হয়ে নেমে আসে। পাকিস্তানের কর্তারপুর গুরুদ্বার প্লাবিত হওয়ার খবর তাই শুধু একটি দেশ বা একটি সম্প্রদায়ের নয়, এটি আসলে মানবতার জন্যই এক বেদনাদায়ক বার্তা।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments