Now human skin is created in a laboratory!: মানব সভ্যতার ইতিহাসে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতি প্রতিনিয়ত বিস্ময় তৈরি করেছে। কখনও ভ্যাকসিন, কখনও কৃত্রিম হৃৎপিণ্ড, আবার কখনও অঙ্গ প্রতিস্থাপনের সাফল্য—প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানুষ নতুন করে বিশ্বাস অর্জন করেছে বিজ্ঞানের ক্ষমতার উপর। সাম্প্রতিক সময়ে সেই তালিকায় যুক্ত হলো এক নতুন সাফল্য—গবেষণাগারে মানুষের ত্বক তৈরি। এক সময়ে যা বিজ্ঞান কল্পকাহিনির অংশ বলে মনে হতো, আজ সেটাই বাস্তব হয়ে উঠছে।ত্বক শুধু শরীরের সৌন্দর্য নয়, এটি শরীরকে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এবং বাইরের জগতের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে। কিন্তু আগুনে পোড়া দুর্ঘটনা, বড়সড় আঘাত বা ত্বকের জটিল রোগে আক্রান্ত হলে মানুষের জীবনে গভীর সংকট নেমে আসে। এই অবস্থায় কৃত্রিম ত্বক চিকিৎসা জগতে এক অভাবনীয় পরিবর্তন আনতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী প্রায় ছয় বছরের গবেষণা শেষে ল্যাবরেটরিতে মানুষের কৃত্রিম ত্বক তৈরি করতে সফল হয়েছেন। এই ত্বক কেবল বাইরের আবরণ নয়, বরং ভেতরে শিরা-উপশিরা, রক্তজালিকা, স্নায়ু এবং এমনকি রোম পর্যন্ত উপস্থিত। থ্রি-ডি প্রযুক্তির সাহায্যে স্তরে স্তরে সাজিয়ে তৈরি করা হয়েছে ত্বকের প্রতিটি স্তর।স্টেম সেল বা শাখা কোষ ব্যবহার করে এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। প্রথমে স্টেম সেল থেকে তৈরি করা হয়েছে রক্তনালী ও স্নায়ুর প্রতিলিপি। তারপর ধাপে ধাপে সাজানো হয়েছে ত্বকের স্তরগুলো। এই ত্বক এতটাই নিখুঁতভাবে তৈরি হয়েছে যে এক নজরে দেখে বোঝার উপায় নেই এটি প্রাকৃতিক না কৃত্রিম।যদিও এই গবেষণা মূলত একাডেমিক পর্যায়ে চলছে, তবুও চিকিৎসা জগতে ও সরকারি পর্যায়ে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে জানানো হয়েছে, এই গবেষণা আগামী দিনে চিকিৎসা বিজ্ঞানের দিগন্ত উন্মোচন করবে। অস্ট্রেলিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রকও এই উদ্যোগকে “গেম-চেঞ্জার” হিসেবে উল্লেখ করেছে।
চিকিৎসকদের মতে, দগ্ধ রোগী থেকে শুরু করে ত্বকের বিরল রোগে আক্রান্ত মানুষদের জন্য এই প্রযুক্তি জীবনদায়ী হতে পারে। সরকারি পর্যায়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে কিভাবে এই আবিষ্কারকে বাস্তব চিকিৎসা ব্যবস্থায় দ্রুত নিয়ে আসা যায়।এই আবিষ্কার নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একদিকে অনেকেই উচ্ছ্বসিত, তাঁরা মনে করছেন যে এই প্রযুক্তি হাজারো মানুষের জীবন বাঁচাতে সক্ষম হবে। বিশেষ করে যাঁরা বড়সড় দুর্ঘটনায় দগ্ধ হয়েছেন তাঁদের পরিবার এই খবর শুনে আশার আলো দেখছেন।অন্যদিকে, নৈতিকতার প্রশ্নও উঠছে। অনেকের মতে, মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বা ত্বক ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা কি মানবতার সঙ্গে খাপ খায়? তবে অধিকাংশ মানুষই একমত যে যদি এটি জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় হয়, তবে একে গ্রহণ করাই উচিত।

এই গবেষণার মূল সাফল্য হলো ত্বকের ভিতরকার জটিল গঠন—রক্তনালী, স্নায়ু ও রোম—সবকিছুই তৈরি করতে পারা। এর ফলে এই ত্বক প্রাকৃতিক ত্বকের মতোই কাজ করতে সক্ষম হবে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অঙ্গ প্রতিস্থাপনে দাতা পাওয়া। কৃত্রিম ত্বক তৈরির মাধ্যমে অন্তত ত্বকের ক্ষেত্রে সেই নির্ভরতা অনেকটাই কমে যাবে।বিশেষজ্ঞদের মতে, পোড়া রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসায় এটি বিপ্লব ঘটাবে। বর্তমানে ত্বক প্রতিস্থাপন করতে গেলে দাতার ত্বক বা রোগীর শরীরের অন্য অংশের ত্বক ব্যবহার করতে হয়। এতে সময় লাগে এবং জটিলতার আশঙ্কাও থেকে যায়। কিন্তু ল্যাবরেটরিতে তৈরি ত্বক ব্যবহার করলে চিকিৎসা হবে দ্রুত, কার্যকরী এবং তুলনামূলকভাবে ঝুঁকিমুক্ত।বিজ্ঞানীরা আশাবাদী যে আগামী এক দশকের মধ্যে এই প্রযুক্তি হাসপাতালগুলিতে ব্যবহার শুরু হবে। তবে এর আগে আরও কিছু ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রয়োজন, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় কৃত্রিম ত্বক মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদে কেমন কাজ করে।

ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি শুধু ত্বকের চিকিৎসায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। স্টেম সেল প্রযুক্তি ব্যবহার করে অঙ্গ প্রতিস্থাপনেও বিপ্লব ঘটতে পারে। হয়তো একদিন ল্যাবরেটরিতেই তৈরি হবে মানুষের লিভার, কিডনি বা হার্ট। তখন অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জন্য আর অপেক্ষা করতে হবে না, বরং ল্যাবরেটরিতেই মেলে যাবে নতুন জীবন।অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানীদের এই অভূতপূর্ব সাফল্য চিকিৎসা জগতে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিল। ল্যাবরেটরিতে তৈরি মানুষের ত্বক শুধু বিজ্ঞানের বিজয় নয়, এটি আগামী দিনে অসংখ্য মানুষের জীবনের রক্ষা করবে। এটি একদিকে মানবতার কাছে আশার আলো, অন্যদিকে নৈতিক প্রশ্নের নতুন দ্বারও খুলে দিল। তবে সব মিলিয়ে বলা যায়—এটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক মাইলফলক।