দীর্ঘতম সাঁতার প্রতিযোগিতা
Longest swimming competition:বাংলার মাটিতে খেলাধুলার ঐতিহ্য বহু পুরনো। গ্রামবাংলার আঙিনায় যেমন কুস্তি বা হাড়কাটার খেলায় মানুষ একত্রিত হতো, তেমনই নদীমাতৃক এই বাংলার অন্যতম গর্ব হলো সাঁতার। পদ্মা, গঙ্গা, ভাগীরথীর বুকে জন্ম নেওয়া এই খেলাধুলা কেবল ক্রীড়ার উৎসব নয়, একপ্রকার সামাজিক ঐক্যের প্রতীক। প্রতিবারের মতো এবছরও সেই ঐতিহ্য রক্ষায় মুর্শিদাবাদ সুইমিং অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হলো বিশ্বের দীর্ঘতম সাঁতার প্রতিযোগিতা।আজ ৩১শে আগস্ট, ভোর রাত পেরিয়ে ঠিক পাঁচটায় মুর্শিদাবাদের সুতির আহিরণ ঘাটে বাজলো প্রতীক্ষিত বাঁশি। সেই মুহূর্তে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল প্রতিযোগীদের মাঝে। ৮১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সাঁতার প্রতিযোগিতা কেবল দৈহিক শক্তির পরীক্ষা নয়, মানসিক দৃঢ়তারও প্রতীক। দেশ-বিদেশের বহু সাঁতারু এই বিশেষ আসরে অংশ নিলেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ প্রথমবারের মতো বাংলার নদীতে নামলেন, কেউ আবার অভিজ্ঞ সাঁতারু হিসেবে নিজের আগের রেকর্ড ভাঙার স্বপ্ন নিয়ে জলে ঝাঁপালেন।প্রতিযোগিতার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন মুর্শিদাবাদ জেলা পরিষদের সভাধিপতি রুবিয়া সুলতানা।
তাঁর হাতে ধ্বনিত বাঁশির সুরেই শুরু হয় এই মহাযজ্ঞ। সেই মুহূর্তে উপস্থিত জনতার উল্লাস নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে মিশে গেল। এ সময় জঙ্গিপুরের সাংসদ খলিলুর রহমান সহ প্রশাসনিক আধিকারিকদের উপস্থিতি প্রতিযোগিতার মর্যাদা আরও বাড়িয়ে দিল।উদ্বোধনী মঞ্চে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জেলা পরিষদের সভাধিপতি রুবিয়া সুলতানা বলেন, “এমন ঐতিহাসিক প্রতিযোগিতা মুর্শিদাবাদের গর্ব। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে শারীরিকভাবে শক্তিশালী ও মানসিকভাবে সাহসী করে তুলতে এই ধরনের উদ্যোগ বিশেষভাবে কার্যকর।”জঙ্গিপুরের সাংসদ খলিলুর রহমানও প্রতিযোগীদের উদ্দেশে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, “এই প্রতিযোগিতা আমাদের জেলাকে আন্তর্জাতিক মানচিত্রে বিশেষ পরিচিতি এনে দিচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকেও আমরা সর্বতোভাবে সহযোগিতা করব।”স্থানীয় মানুষের উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। ভোর রাত থেকে হাজার হাজার মানুষ আহিরণ ঘাটে ভিড় জমিয়েছিলেন প্রতিযোগীদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য।
সুতির বাসিন্দা আফসার আলি বললেন, “এমন আয়োজন আমাদের গ্রামে বছরে একদিন উৎসবের পরিবেশ তৈরি করে। আমাদের ছেলে-মেয়েরা এই প্রতিযোগিতা দেখে অনুপ্রাণিত হয়।”স্থানীয় স্কুলের শিক্ষক মধুমিতা দত্তের মতে, “এই প্রতিযোগিতা শুধু ক্রীড়া নয়, স্বাস্থ্যসচেতনতার বার্তাও বহন করে। নদী আমাদের জীবনের অঙ্গ, তার সঙ্গেই মিশে আছে খেলাধুলার এই ইতিহাস।”৮১ কিলোমিটার দীর্ঘ সাঁতার প্রতিযোগিতা নিছকই এক দিনের অনুষ্ঠান নয়। এটি বাংলার ক্রীড়া ইতিহাসে একটি মহাকাব্যের মতো। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই প্রতিযোগিতার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বিশ্বের নানা প্রান্তের সাঁতারুরা এখানে অংশগ্রহণ করায় মুর্শিদাবাদের নাম বিশ্বমঞ্চে উজ্জ্বল হচ্ছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন প্রতিযোগিতা কেবল ক্রীড়াক্ষেত্রেই নয়, পর্যটন ও অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। প্রতিযোগিতার দিনে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আয় বেড়ে যায়। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে পরিবহন, সব ক্ষেত্রেই একদিনের জন্য হলেও বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়।