Journalist killed in Israeli attack in Gaza:গাজা উপত্যকা, যেখানে প্রতিদিন যুদ্ধ আর সংঘর্ষের ছাপ লেগে থাকে, সেখানে সম্প্রতি আরও একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। ইসরায়েলি বাহিনীর পৃথক হামলায় গাজার দুই সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজন আল-জাজিরার সাংবাদিক হোসাম শাবাত, বয়স মাত্র ২৩ বছর। অন্যজন মোহাম্মদ মানসুর, যিনি ‘প্যালেস্টাইন টুডে’-তে কর্মরত ছিলেন। এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলি শুধু সাংবাদিক সমাজেই নয়, গোটা বিশ্বেই শোকের ছায়া ফেলেছে এবং যুদ্ধের নিষ্ঠুর বাস্তবতা আরও প্রকট করে তুলেছে।
ইসরায়েলি হামলা ও সাংবাদিকদের মৃত্যু
গাজার উত্তরে বেইত লাহিয়ার পূর্বাঞ্চলে আল-জাজিরার সাংবাদিক হোসাম শাবাতের গাড়িতে হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। মাত্র ২৩ বছর বয়সেই তার জীবনযাত্রা থেমে গেল এই নিষ্ঠুর আক্রমণে। সাংবাদিকতার ময়দানে হোসাম ছিলেন নতুন মুখ, কিন্তু তাঁর সাহস ও নিষ্ঠা নজর কেড়েছিল সহকর্মীদের। অন্যদিকে, দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস এলাকায় আরেকটি হামলায় প্রাণ হারালেন মোহাম্মদ মানসুর। তিনি তাঁর বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে ছিলেন, যখন ইসরায়েলি হামলায় তাঁর ঘরটিই ধ্বংস হয়ে যায়।
স্থানীয় জনগণের প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনাগুলি গাজার সাধারণ মানুষের মনে গভীর শোক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। একদিকে তাঁদের মনে ভয়, অন্যদিকে ন্যায়ের দাবি। স্থানীয় বাসিন্দা আমির আলি এই ঘটনার প্রসঙ্গে বললেন, “আমরা প্রতিদিন মৃত্যুর মুখোমুখি হই, কিন্তু সাংবাদিকরাও যদি আর সুরক্ষিত না থাকেন, তাহলে আমাদের কণ্ঠস্বর কে তুলে ধরবে? তাঁদের হত্যা করা মানে আমাদের অস্তিত্বকেই হত্যা করা।”
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও নিন্দা
এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং এই হামলার তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। গুতেরেস বলেন, “সাংবাদিকরা যুদ্ধক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এটা খুবই দুঃখজনক যে তাঁদের মতো নিরপরাধ মানুষকেও জীবন দিতে হলো।”
এছাড়াও, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংগঠন এই হামলার তীব্র নিন্দা করেছে। তাঁরা একসুরে বলেছেন, “যুদ্ধক্ষেত্রের সাংবাদিকদের হত্যা মানে সত্যকে হত্যা করা।”
গাজার সাংবাদিকদের সংগ্রাম
গাজার সাংবাদিকরা প্রতিদিন প্রাণ হাতে করে কাজ করেন। যুদ্ধ, বোমাবর্ষণ, এবং গোলাগুলির মধ্যেও তাঁরা মানুষের দুর্দশা, প্রতিবাদ, এবং জীবনসংগ্রামের কাহিনি তুলে ধরেন। কিন্তু এই কাজ করতে গিয়ে তাঁদের জীবনের ঝুঁকি ক্রমাগত বাড়ছে। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা যেখানে আক্রান্ত, সেখানে তাঁদের কণ্ঠস্বর দমন করার এমন চেষ্টা যুদ্ধের নীতিগত দিককেও প্রশ্নের মুখে ফেলে।
ইসরায়েলি দাবি এবং বিবৃতি
ইসরায়েলি বাহিনীর পক্ষ থেকে এই হামলার বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি আসেনি। তবে অতীতে ইসরায়েল বরাবরই দাবি করে এসেছে যে তারা সন্ত্রাসী কার্যকলাপ এবং হামাসের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, কেন নিরপরাধ নাগরিক এবং সাংবাদিকরা হামলার শিকার হচ্ছেন?
সাংবাদিকদের নিরাপত্তার দাবি
এই হামলার পর বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের নিরাপত্তার দাবি জোরালো হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে সাংবাদিকরা যাতে নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারেন, সেজন্য আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়নের দাবি উঠেছে। অনেকেই বলছেন, সংবাদমাধ্যম যদি সত্য ঘটনা তুলে ধরতে না পারে, তাহলে যুদ্ধের ভেতরের নিষ্ঠুরতাগুলি কখনওই প্রকাশ পাবে না।
মোহাম্মদ মানসুর ও হোসাম শাবাতের জীবনের গল্প
নিহত দুই সাংবাদিকের জীবনকাহিনিও সংবাদমাধ্যমের প্রতি তাঁদের নিষ্ঠার সাক্ষ্য দেয়। হোসাম শাবাত খুব অল্প বয়সেই আল-জাজিরায় যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল, একদিন তিনি সারা বিশ্বের মানুষকে গাজার সত্য ঘটনা তুলে ধরবেন। আর মোহাম্মদ মানসুর ছিলেন গাজার অন্যতম অভিজ্ঞ সাংবাদিক। তাঁর রিপোর্টিং বহুবার আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছে।
গাজা-ইসরায়েল সংঘর্ষ: দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস
গাজা উপত্যকায় ইসরায়েল ও প্যালেস্টাইনের সংঘর্ষ বহুদিনের। এই সংঘর্ষের মূল কারণ ভূমি দখল, রাজনৈতিক বিরোধ, এবং ধর্মীয় বিভাজন। কিন্তু এর মাঝখানে সাধারণ মানুষের দুর্দশা এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
উপসংহার
সাংবাদিকদের হত্যা শুধু একটি জীবন নিভিয়ে দেয় না, এটি সত্য এবং ন্যায়বিচারের কণ্ঠকেও স্তব্ধ করে। হোসাম শাবাত এবং মোহাম্মদ মানসুরের মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে যুদ্ধ শুধু সীমানা বা রাজনৈতিক ক্ষমতা নিয়ে নয়, এটি মানুষের জীবন এবং সত্যের জন্যও একটি চিরন্তন লড়াই। গাজার এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলি যেন ভবিষ্যতে বিশ্ববাসীকে শান্তি এবং সাংবাদিকতার স্বাধীনতার গুরুত্ব উপলব্ধি করায়।