Indian government’s data control case against X:বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তি ইলন মাস্কের মালিকানাধীন জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার) ভারত সরকারের বিরুদ্ধে কর্ণাটক হাইকোর্টে একটি মামলা দায়ের করেছে। এই ঘটনা গোটা দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলেও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। এক্স-এর অভিযোগ, ভারত সরকার তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৭৯(৩)(বি) ধারা ব্যবহার করে বেআইনিভাবে তাদের কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করছে এবং বিভিন্ন পোস্ট ও তথ্য সরাতে চাপ সৃষ্টি করছে। এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় সরাসরি হস্তক্ষেপ বলেই মনে করছে ইলন মাস্কের সংস্থা।
মামলার পটভূমি এবং অভিযোগ
এক্স-এর তরফে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, ভারত সরকার কনটেন্ট সেন্সর করার ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশ বা বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সরাসরি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে নির্দেশ দিচ্ছে। এই সেন্সরশিপ বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং সামাজিক বিষয়ক কনটেন্ট সরানোর ক্ষেত্রে লাগু করা হচ্ছে। এক্স-এর মতে, এটি সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী নির্দেশনার পরিপন্থী এবং সংবিধানে উল্লেখিত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার লঙ্ঘন করছে।
এই প্রসঙ্গে, এক্সের মুখপাত্র জানান, “আমরা গণতন্ত্র এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে শ্রদ্ধা করি। তবে আমাদের প্ল্যাটফর্মে যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপ তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন তা সুনির্দিষ্ট বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়।”
ভারত সরকারের অবস্থান
যদিও ভারত সরকার এই মামলার বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি, তবে সূত্রের খবর অনুযায়ী, তারা মনে করছে যে দেশের আইন মেনেই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক বেশ কয়েকবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলিকে নির্দেশ দিয়েছে ‘উস্কানিমূলক’, ‘মিথ্যা’ এবং ‘গণতন্ত্রবিরোধী’ পোস্ট সরানোর জন্য। সরকারের যুক্তি, এই ধরনের কনটেন্ট দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, সামাজিক শৃঙ্খলা এবং ঐক্যের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
মামলার প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
এই মামলা শুধু ইলন মাস্কের এক্স বনাম ভারত সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ভবিষ্যতে ভারতের ডিজিটাল নীতি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। যদি আদালত এক্স-এর পক্ষে রায় দেয়, তাহলে সরকারের সেন্সরশিপ ক্ষমতা সীমাবদ্ধ হতে পারে। এর ফলে সাধারণ ব্যবহারকারীরা আরও মুক্তভাবে মতপ্রকাশ করতে পারবেন এবং প্ল্যাটফর্মগুলির স্বাধীনতা বজায় থাকবে। অন্যদিকে, যদি আদালত সরকারের পক্ষে রায় দেয়, তাহলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলির উপর নিয়ন্ত্রণ আরও কড়া হতে পারে এবং তথ্য আদানপ্রদানের ক্ষেত্রে সেন্সরশিপের মাত্রা বাড়তে পারে।
ইলন মাস্কের ভারতে ব্যবসার প্রভাব
এখানে একটি বড় প্রশ্ন হলো, এই মামলার প্রভাব ইলন মাস্কের অন্যান্য উদ্যোগ, যেমন টেসলা এবং স্টারলিংকের ভারতীয় বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে কী প্রভাব ফেলবে। টেসলা ভারতে ইলেকট্রিক গাড়ির বাজারে প্রবেশের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে স্টারলিংক ইতিমধ্যেই স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
এই মামলা যদি ইলন মাস্কের সংস্থার জন্য নেতিবাচক হয়, তাহলে ভারতে তার অন্যান্য ব্যবসায়িক পরিকল্পনাতেও জটিলতা তৈরি হতে পারে। কারণ, সরকারের সঙ্গে সংঘাত মূলত ব্যবসার পরিবেশ এবং নীতিগত সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে।
স্থানীয় স্তরে প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনা যেমন আন্তর্জাতিক স্তরে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে, তেমনই ভারতের মধ্যেও স্থানীয় মানুষ এবং বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ মনে করছেন, সরকারের কড়া পদক্ষেপ দেশের সুরক্ষার জন্য জরুরি। আবার কেউ বলছেন, এই ধরনের সেন্সরশিপ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ।
পাঁশকুড়ার মতো মফস্বল এলাকায় বসবাসকারী রাহুল পাল বলেন, “আমরা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন খবর পাই। যদি সরকার সব কিছু কন্ট্রোল করতে শুরু করে, তাহলে আমাদের জানার অধিকার কমে যাবে।” অন্যদিকে, শিক্ষিকা প্রণতি সেনের মত, “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকা উচিত, তবে তা যেন কারও ভাবাবেগে আঘাত না করে এবং দেশের আইন মেনে চলে।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং সরকারের জটিল সম্পর্ক
এটি প্রথমবার নয়, যখন ভারতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং সরকারের মধ্যে সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এর আগে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং গুগলের মতো সংস্থাগুলিও সরকারের বিভিন্ন নির্দেশের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে।
২০২১ সালে টুইটার ভারত সরকারের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি কনটেন্ট সেন্সর করার বিষয়ে প্রশ্ন তোলে। সেই সময়ও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছিল। এই ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে, ডিজিটাল যুগে তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং সেন্সরশিপের বিষয়টি ক্রমশ জটিল এবং বিতর্কিত হয়ে উঠছে।
উপসংহার
ভারত সরকারের বিরুদ্ধে ইলন মাস্কের এক্স-এর মামলা একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিতে পারে। এটি শুধু একটি কনটেন্ট সেন্সরশিপের মামলা নয়, বরং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বনাম রাষ্ট্রের সুরক্ষা এবং শৃঙ্খলার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার লড়াই। আগামী দিনে এই মামলার ফলাফল শুধুমাত্র ভারতের ডিজিটাল নীতি নয়, বরং বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্যও উদাহরণ হতে পারে।