Horrific road accident in Uttar Pradesh, truck hits tractor loaded with pilgrims:-রবিবার গভীর রাতে উত্তরপ্রদেশের বুলন্দশহর ও আলিগড়ের সীমানায় ঘটে গেল এক হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা, যা যেন মুহূর্তের মধ্যেই কয়েকটি পরিবারকে চিরদিনের জন্য শোকস্তব্ধ করে দিল। রাত তখন প্রায় ২টো ১০ মিনিট, চারদিক নিস্তব্ধ, তীর্থযাত্রী বোঝাই এক ট্রাক্টর ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল রাজস্থানের উদ্দেশ্যে। যাত্রীরা সবাই কাসগঞ্জ থেকে আসা, তাঁদের গন্তব্য ছিল রাজস্থানে অবস্থিত জহরপীরের দরগাহ। কিন্তু তাঁদের এই ভক্তি ও বিশ্বাসের যাত্রাপথে আচমকাই নেমে এল অন্ধকার—পিছন থেকে ধেয়ে আসা এক ট্রাক ভয়ঙ্কর শব্দে ধাক্কা মারে ট্রাক্টরটিতে। মুহূর্তের মধ্যে উলটে যায় ট্রাক্টর, ছিটকে পড়েন তীর্থযাত্রীরা। চিৎকার, আহাজারি আর রক্তমাখা দেহে ভরে ওঠে রাতের অন্ধকার। পুলিশ সূত্রে খবর, ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় অন্তত আটজন তীর্থযাত্রীর, তাঁদের মধ্যে দু’জন শিশু। আরও অন্তত ৪৩ জন গুরুতর আহত হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে ১২ জন আবার নাবালক। প্রশাসন জানিয়েছে, আহতদের দ্রুত বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়—আলিগড় মেডিক্যাল কলেজ, বুলন্দশহর জেলা হাসপাতাল ও খুরজার কৈলাশ হাসপাতালে শুরু হয় চিকিৎসা। এর মধ্যে ১০ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসার পরে ছেড়ে দেওয়া হলেও বাকিদের অবস্থা এখনও উদ্বেগজনক।

দুর্ঘটনার পর ট্রাকচালক ঘটনাস্থল ছেড়ে পালিয়ে যায়, তবে পুলিশ তৎপরতার সঙ্গে ঘাতক ট্রাকটিকে আটক করেছে। এসএসপি, জেলাশাসক এবং উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা ইতিমধ্যেই হাসপাতালে গিয়ে আহতদের খোঁজখবর নিয়েছেন এবং আশ্বাস দিয়েছেন যে প্রত্যেকটি পরিবারকে প্রয়োজনীয় সাহায্য করা হবে। এই দুর্ঘটনা শুধু উত্তরপ্রদেশ নয়, গোটা দেশকেই শোকস্তব্ধ করে দিয়েছে, কারণ ধর্মীয় বিশ্বাসে ভর করে যাত্রাপথে বের হওয়া মানুষদের এমন নির্মম মৃত্যু সত্যিই অকল্পনীয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, আরনিয়া বাইপাসে প্রায়ই ভারী যানবাহন দ্রুতগতিতে ছুটে চলে, রাতের অন্ধকারে ট্রাকের গতি কম থাকে না, তাই দুর্ঘটনার ঝুঁকি সবসময় থেকেই যায়। তাঁদের দাবি, অবিলম্বে এই রাস্তায় বাড়ানো হোক পুলিশি নজরদারি ও স্পিড মনিটরিং, না হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা আরও বাড়বে। মৃতদের পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। রাজেশ যাদব নামে এক স্বজন বলেন,
“আমার ভাইপোকে নিয়ে যাচ্ছিলাম তীর্থ করতে, ভেবেছিলাম ভোর হতেই পৌঁছে যাব, কিন্তু ভাগ্য এতটা নিষ্ঠুর হবে ভাবিনি। চোখের সামনে ওকে হারালাম।” আবার আহত তীর্থযাত্রী কিশোরী পূজা দেবী জানান, “আমরা সবাই গান গাইতে গাইতে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ পেছন থেকে প্রচণ্ড শব্দ, তারপর আর কিছু মনে নেই। জ্ঞান ফিরতেই দেখি হাসপাতালে।” এই ধরনের ঘটনায় সবচেয়ে বড় আঘাত নেমে আসে শিশুদের ওপর। তাঁদের অনেকেই বুঝতেই পারছে না, কেন হঠাৎ তাঁদের পরিবার ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তরপ্রদেশে এ ধরনের দুর্ঘটনার সংখ্যা ক্রমশই বাড়ছে। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, শুধু ২০২৩ সালেই রাজ্যে ২০ হাজারেরও বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশেই প্রাণ হারিয়েছেন তীর্থযাত্রী বা যাত্রাপথে থাকা সাধারণ মানুষ। পরিবহণ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাতের বেলা ভারী যানবাহনের চলাচলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, হাইওয়েতে সিসিটিভি ক্যামেরার সংখ্যা বাড়ানো এবং ট্রাক-ট্রাক্টর চালকদের জন্য বাধ্যতামূলক বিশ্রামের নিয়ম চালু করলেই দুর্ঘটনা অনেকটা কমানো সম্ভব হবে। কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকেও এই দুর্ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এক মুখপাত্র বলেন, “আমরা রাজ্য প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করব। নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে এবং আহতদের চিকিৎসার সমস্ত খরচ সরকার বহন করবে।” তবে প্রশ্ন উঠছে, শুধু ক্ষতিপূরণ দিলেই কি সমস্যার সমাধান হবে?

রাস্তায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করেন, তার প্রকৃত প্রতিকার কী? উত্তরপ্রদেশের এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা আবারও আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, উন্নয়নের যুগে দাঁড়িয়েও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতটা অনিশ্চিত। দুর্ঘটনার পর সামাজিক মাধ্যমে শোক ও ক্ষোভের ঢেউ বয়ে গেছে। বহু মানুষ লিখেছেন, “ধর্মীয় ভক্তিতে ভর করে যাত্রা শুরু করেছিলেন, অথচ গন্তব্যে পৌঁছতে পারলেন না—এটাই সবচেয়ে বেদনার।” অনেকে আবার সরকারের প্রতি ক্ষোভ উগরে দিয়ে লিখেছেন, “রাস্তায় পুলিশি নজরদারি শুধু কাগজে-কলমে, বাস্তবে কিছুই হচ্ছে না।” এই দুর্ঘটনা নিছক একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি আবারও আমাদের মনে করিয়ে দিল, জীবনের অনিশ্চয়তা কতটা ভয়াবহ হতে পারে। হয়তো সকলে মিলে সঠিক ব্যবস্থা নিলে এ ধরনের মৃত্যুকে ঠেকানো যেত। আজ মৃতদের আত্মার শান্তি কামনা করছে দেশ, আর আহতদের দ্রুত সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করছে। কিন্তু প্রশাসনের কাছে প্রশ্ন থেকে যাবে—কবে রাস্তায় মানুষ সত্যিই নিরাপদ বোধ করবে?