Hilsa in mid-day meal : স্কুলের মিড-ডে মিল মানেই সাধারণত একঘেয়ে খাবারের তালিকা—খিচুড়ি, সাদা ভাত, ডাল, সিদ্ধ ডিম কিংবা সোয়াবিনের তরকারি। দিনের পর দিন সেই একই মেনুতে শিশুদের আগ্রহ কমে যায়, অনেক সময় খাবার অপচয়ও ঘটে। অথচ মিড-ডে মিল প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই ছিল পুষ্টিকর খাদ্যের মাধ্যমে পড়ুয়াদের স্কুলমুখী করা।এমন একঘেয়েমি কাটিয়ে ছকভাঙা উদ্যোগ নিলেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক সরকারি স্কুল। সেখানে মিড-ডে মিলে পরিবেশিত হল বাংলার গর্ব, রসনার রাজা—ইলিশ মাছ! যা চমকে দিয়েছে গোটা এলাকা, এবং ছাত্রছাত্রীদের মুখে এনে দিয়েছে উচ্ছ্বাসের হাসি।
ঘটনাটি ঘটেছে দক্ষিণ ২৪ পরগনার মথুরাপুর ২ নম্বর ব্লকের উলুবাড়ি বেড়মাল অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এই স্কুলে প্রায় ১০০ জন পড়ুয়া এবং ৩ জন শিক্ষক রয়েছেন। দিনটা ছিল অন্য রকম—মিড-ডে মিলের তালিকায় ছিল খিচুড়ি, বেগুন ভাজা, মিষ্টি আর সঙ্গে চমকপ্রদ সংযোজন—ইলিশ ভাজা!ছোট্ট ছাত্রীরা খেতে বসে চোখ কচলে তাকিয়েছে পাতে পড়ে থাকা রূপালি মাছটার দিকে। এমন চমক তারা আগে কখনও পায়নি। এই মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে স্কুলের এক ছাত্রী অনুশ্রী বৈদ্য বলে, “আমার খুব ভালো লেগেছে। এতদিন খিচুড়ি, ডিম খেয়েছি, কিন্তু আজ ইলিশ মাছ পেয়ে খুব খুশি।”এই উদ্যোগের পিছনে রয়েছেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক শশাঙ্ক হালদার। ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং সম্পূর্ণ নিজস্ব খরচে তিনি এই দিনের জন্য ইলিশ সরবরাহের ব্যবস্থা করেন। তার মতে, “রায়দিঘি ঘাট থেকে প্রতিদিন প্রচুর ইলিশ মাছ ধরা পড়ে, যা সরাসরি কলকাতা বা অন্যান্য শহরে চলে যায়। অথচ এখানকার প্রান্তিক পরিবারের ছেলেমেয়েরা সেই মাছ ছুঁতেও পারে না। তাই মিড-ডে মিলের রোজকার একঘেয়ে তালিকার বাইরে একটুখানি আনন্দ দেওয়ার জন্য এই উদ্যোগ।”

বিশেষ উদ্যোগটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত হলেও মিড-ডে মিল প্রকল্পের প্রশাসনিক দিক নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও সরকারি কোনো প্রতিক্রিয়া এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পাওয়া যায়নি, তবুও এলাকার শিক্ষাকর্মীরা মনে করছেন, এই ধরণের মানবিক উদ্যোগ মিড-ডে মিল প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যকে নতুন মাত্রা দিতে পারে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—যেখানে সরকারি বরাদ্দে খাবারের মান নিয়ে প্রায়ই অভিযোগ ওঠে, সেখানে একজন শিক্ষক যদি এমন মন থেকে কিছু করতে পারেন, তাহলে বৃহত্তর স্তরে এই ভাবনাকে উৎসাহ দেওয়া উচিত। ব্যতিক্রমী ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই গোটা এলাকায় শুরু হয়েছে আলোচনা। কেউ কেউ বলছেন, “এটাই তো শিক্ষকতা—শুধু পড়ানো নয়, পড়ুয়াদের মুখে হাসি ফোটানো।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের একজন বলেন, “আমরা তো ভাবতেই পারিনি, মিড-ডে মিলে ইলিশ পড়তে পারে! এটা শুধু একটা মাছ নয়, আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আবেগ। ছোটরা যখন সেটার স্বাদ পায়, সেটা শুধু খাওয়ার নয়—একটা স্মৃতি হয়ে থাকে।”এমনকি অন্য স্কুলের অভিভাবকরাও এই ঘটনার প্রশংসা করেছেন। অনেকেই বলছেন, যদি একটু ইচ্ছা থাকে, তবে মিড-ডে মিলও হতে পারে শিশুদের জন্য আনন্দের উৎস।

মাছ মানেই সাধারণভাবে বিলাসবহুল খাবারের প্রতীক। বাজারে যার দাম দিন দিন ছুঁই ছুঁই করছে হাজারের ঘর, সেই ইলিশ একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মিড-ডে মিলের অংশ হওয়া নিঃসন্দেহে এক বড় চমক।এই উদ্যোগ প্রমাণ করে দেয়, মিড-ডে মিল শুধু পেট ভরানোর খাদ্য নয়, বরং তা হতে পারে আনন্দ, উদ্দীপনা ও আবেগের মাধ্যম। বিশেষ করে শিশুদের জন্য, যারা রোজ রোজ এক রকমের খাবারে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে, তাদের মুখে হাসি ফিরিয়ে আনতে এমন ভিন্নতা খুব গুরুত্বপূর্ণ।এছাড়া এই ঘটনার সামাজিক বার্তাও আছে—সুদূর গ্রামে, প্রান্তিক পরিবারের বাচ্চারাও যেন ভালো কিছু পাওয়ার অধিকার রাখে। তাদের পাতে একদিনের জন্য হলেও পড়ুক “রূপালি স্বপ্ন”

ঘটনা নিঃসন্দেহে একটি বার্তা দেয়—সিস্টেমের বাইরে গিয়েও ভালো কিছু করা যায়, যদি ইচ্ছে থাকে। তবে প্রশ্ন হল, এই উদাহরণ থেকে শিক্ষা নিয়ে অন্যান্য বিদ্যালয় কি অনুপ্রাণিত হবে?সরকার যদি মিড-ডে মিলের জন্য বরাদ্দ বাড়িয়ে বা বিশেষ দিনে বিশেষ মেনু চালু করার মতো ভাবনাচিন্তা করে, তবে আরও বেশি শিশুর মুখে হাসি ফোটানো সম্ভব।একজন শিক্ষকের একদিনের স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ দেখিয়ে দিল, শিক্ষা মানে শুধুই সিলেবাস নয়—বরং শিশুর সার্বিক বিকাশ ও ভালো থাকার দায়িত্বও শিক্ষকের হাতে।একটি ছোট্ট স্কুল, একজন আন্তরিক শিক্ষক, আর একটি রূপালি মাছ—এই তিনে মিলে তৈরি হল এক বড় গল্প। মিড-ডে মিলের সেই একঘেয়ে খিচুড়ির পাতে আজ ইলিশ এসে বলল, “শুধু খাওয়াই নয়, ভালোবাসাও পাতে পড়তে পারে।”এটা শুধু সুন্দরবনের একটি গ্রামের খবর নয়, এটি গোটা সমাজের জন্য এক বার্তা—আনন্দ ছড়ানো যায়, যদি মন থেকে চাওয়া যায়। শিক্ষার মান বাড়ানোর পাশাপাশি যদি শিশুদের জীবনে এমন মুহূর্ত যোগ করা যায়, তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়ে উঠবে আরও হৃদয়বান, আরও মানবিক।