Elon Musk’s company Starlink is entering India: একটা সময় ছিল যখন ইন্টারনেট মানেই শহুরে বিলাসিতা, গ্রামগঞ্জ বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে সেটা ছিল স্বপ্নের মতো জিনিস। মোবাইল টাওয়ার উঠলেও অনেক সময় সিগন্যাল দুর্বল, নেটের গতি কচ্ছপের মতো ধীর আর পরিষেবা অস্থির। অথচ আজকের দিনে ইন্টারনেট শুধু আড্ডা, সিনেমা বা গেম খেলার মাধ্যম নয়—এটা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা, কৃষি, ব্যাংকিং, এমনকি সরকারি পরিষেবারও প্রধান অবলম্বন। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে এলন মাস্কের সংস্থা স্টারলিংক ভারতে পা রাখতে চলেছে—খবরটা যেন এক নতুন সূর্যের আলো। স্টারলিংকের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা মানে আকাশে হাজারো ছোট ছোট স্যাটেলাইট থেকে সরাসরি আপনার ঘরে পৌঁছে যাবে ব্রডব্যান্ডের মতো দ্রুত ইন্টারনেট। সম্প্রতি UIDAI অর্থাৎ আধার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে স্টারলিংকের পার্টনারশিপের ঘোষণা কার্যত বলে দিচ্ছে, এই সংস্থার যাত্রা ভারতে এখন আর কল্পনা নয়, বাস্তব হতে চলেছে। জানা গেছে, গ্রাহকদের পরিচয় যাচাই করতে বা কেওয়াইসি প্রক্রিয়া সহজ করতে আধার ব্যবহার করা হবে। এর ফলে সাধারণ মানুষ খুব সহজে, কম সময়ে পরিষেবা নিতে পারবেন। ইতিমধ্যেই ভারতের ডিপার্টমেন্ট অফ টেলি কমিউনিকেশন বা DOT সবুজ সংকেত দিয়েছে এবং ন্যাশনাল স্পেস প্রমোশন অ্যান্ড অথরাইজেশন সেন্টার থেকেও স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের অনুমতি মিলেছে।
অর্থাৎ প্রশাসনিক সবুজ সংকেত ইতিমধ্যেই জ্বলজ্বল করছে, কেবল বাকি আনুষ্ঠানিক কিছু প্রস্তুতি। তবু কবে থেকে পরিষেবা চালু হবে, সেটা নিয়ে এখনও অফিসিয়ালি মুখ খোলেনি স্টারলিংক। তবে এই UIDAI পার্টনারশিপ ইঙ্গিত দিচ্ছে, প্রস্তুতি খুব দ্রুত এগোচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এর প্রভাব কী হবে ভারতের সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় সমাজে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবচেয়ে বড় লাভ হবে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলির। যেমন ধরুন, সুন্দরবন, ঝাড়খণ্ড বা অরুণাচলের কোনো পাহাড়ি গ্রাম যেখানে এখনো নেট পৌঁছতে হিমশিম খায়, সেখানে স্টারলিংকের ডিশ লাগালেই আকাশ থেকে নেমে আসবে ইন্টারনেট। আর তাতেই শিক্ষা থেকে স্বাস্থ্য পরিষেবা—সবই পাল্টে যেতে পারে। ভাবুন, কোনো গ্রামীণ ছাত্র আজ অনলাইনে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে কারণ তার কাছে নেই স্থায়ী নেটওয়ার্ক। স্টারলিংক এলে সেই বঞ্চনা কমবে। আবার কোনো দূরবর্তী হাসপাতালে জরুরি টেলি-মেডিসিন সার্ভিস বা বড় শহরের ডাক্তারদের সঙ্গে ভিডিও কনসালটেশন সহজ হবে। কৃষকরাও কৃষি বিষয়ক তথ্য, আবহাওয়া, দাম ইত্যাদি সঙ্গে সঙ্গে জানতে পারবেন। ব্যবসায়ীরাও অনলাইন লেনদেন ও ই-কমার্সের মাধ্যমে নতুন দিগন্ত খুলতে পারবেন। স্টারলিংকের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—এটা কোনো টাওয়ার বা ভূখণ্ডভিত্তিক অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল নয়। তাই প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা বা ঝড়ের সময় যখন সাধারণ টেলিকম পরিষেবা ভেঙে পড়ে, তখনও স্যাটেলাইট ইন্টারনেট অটুট থাকতে পারে। এর ফলে দুর্যোগ মোকাবিলায় নতুন মাত্রা যোগ হবে। প্রসঙ্গত, আজকের দিনে ভারত ডিজিটাল ইন্ডিয়া প্রকল্পে ঝাঁপিয়েছে। সরকারি পরিষেবা থেকে ব্যাংকিং—সবকিছুই অনলাইনে চলে আসছে। কিন্তু ইন্টারনেট বঞ্চিত মানুষরা সেই সুফল থেকে দূরে।

এই প্রেক্ষাপটে স্টারলিংক ভারতের ডিজিটাল বিভাজন কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। তবে সবকিছুরই যেমন উল্টোপিঠ আছে, এখানেও কিছু আশঙ্কা রয়েছে। প্রথমত, স্টারলিংকের পরিষেবার খরচ। বর্তমানে বিশ্বে গড়ে এর দাম অনেকটাই বেশি। যেমন আমেরিকায় স্টারলিংকের মাসিক খরচ প্রায় ১১০ ডলার, যা ভারতীয় টাকায় প্রায় ৯,০০০ টাকার কাছাকাছি। যদি ভারতে এই দাম না কমে, তবে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থেকে যাবে। দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা এবং তথ্য সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। UIDAI-এর সঙ্গে পার্টনারশিপ নিরাপত্তা বাড়ালেও ডেটা কোথায় সঞ্চিত হচ্ছে এবং কিভাবে ব্যবহার হচ্ছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাবে। এ ছাড়া জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একাংশ স্যাটেলাইট ভিড়ে মহাকাশ দূষণ বা ‘স্পেস ডেব্রিস’-এর আশঙ্কা তুলেছেন। তবে সামগ্রিকভাবে মানুষ কিন্তু আশাবাদী। প্রসেনজিৎ নামে এক গ্রামীণ শিক্ষক বললেন, “আজও আমাদের গ্রামে পড়ুয়ারা নেট না থাকায় অনলাইনে ক্লাস করতে পারে না। যদি সত্যিই এই পরিষেবা আসে, তবে এটা এক ধরনের বিপ্লব।” একজন তরুণ ব্যবসায়ী দেবাশিসের মতে, “ডিজিটাল পেমেন্ট, অনলাইন বিক্রি—সব করতে গেলে দ্রুত নেট চাই। আমরা বহুদিন ধরে অপেক্ষা করছি, হয়তো এবার সেই স্বপ্ন পূরণ হবে।” অন্যদিকে এক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ বললেন, “ভারতের মতো দেশে যেখানে ৭০ কোটির বেশি ইন্টারনেট ইউজার, সেখানে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট একটা বড় গেমচেঞ্জার হতে পারে, যদি দাম নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।” ভারত সরকারের তরফ থেকেও আশার বার্তা শোনা যাচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, “ডিজিটাল বিভাজন কমাতে আমরা চাইছি প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট পৌঁছাক। স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেই কাজেই সাহায্য করবে।” সব মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে, স্টারলিংক শুধুমাত্র একটি টেলিকম সংস্থা নয়, এটা ভারতের সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক নতুন অধ্যায় খুলে দিতে চলেছে। গ্রাম ও শহরের ফারাক কমানো থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ব্যবসায় নতুন গতি এনে দেবে এই পরিষেবা। এখন কেবল অপেক্ষা—কবে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আকাশের নেট’ নেমে আসবে আমাদের ঘরে।