Elephant and calf on railway tracks, driver applies emergency brakes:-রাত তখন গভীর, উত্তরবঙ্গের চাপরামারি জঙ্গলের চারপাশ নিস্তব্ধ, শুধু ঝিঁঝিঁর ডাক আর বাতাসের শব্দই প্রকৃতির নিস্তব্ধতা ভাঙছিল। ঠিক সেই সময়ে, প্রায় রাত দুটো নাগাদ ডাউন কবিগুরু এক্সপ্রেস যখন নাগরাকাটা ও চালসা স্টেশনের মাঝামাঝি ৬৯/০ নম্বর পিলারের কাছে পৌঁছোয়, তখন ঘটে এক হৃদয়স্পর্শী ঘটনা। রেললাইনের উপর আচমকা দেখা যায় একটি ছোট্ট হাতি-শাবক, যে হয়তো মা-কে খুঁজতে খুঁজতে বা কৌতূহলবশত লাইনে উঠে এসেছিল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সেখানে উপস্থিত হয় মা হাতিটি। পরিস্থিতি তখন একেবারেই সংকটজনক—একদিকে ২৩ কামরার একটি দ্রুতগামী ট্রেন, আর অন্যদিকে বনের দুই বাসিন্দা, যাদের জীবন এক মুহূর্তেই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারত। কিন্তু সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা এড়াতে অসাধারণ সাহস ও মানবিকতার পরিচয় দেন ট্রেনের চালক প্রকাশ কুমার ও সহকারী কামরু মন্ডল। ক্ষণিকের মধ্যেই তাঁরা জরুরি ব্রেক কষে ট্রেন থামিয়ে দেন। ফলত, প্রাণ বাঁচল মা হাতি ও শাবকের, আর এড়ানো গেল এক বড় দুর্ঘটনা। ট্রেন তখন প্রায় ২৩ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকে। যাত্রীরা প্রথমে আতঙ্কিত হলেও পরে বুঝতে পারেন ঘটনার গুরুত্ব। মা হাতি ও শাবক ধীর পায়ে রেললাইনের উপর দিয়ে প্রায় ১,২০০ মিটার হেঁটে চলে যায়। তাদের জঙ্গলে প্রবেশ করার পরেই পুনরায় ট্রেন যাত্রা শুরু করে। এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করা অনেক যাত্রী জানান, “এ যেন সিনেমার দৃশ্য, যেখানে জীবনের চেয়ে মূল্যবান আর কিছু হতে পারে না।” এই ঘটনার পর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে ঝড় তুলেছে আলোচনা। অনেকেই চালক ও তাঁর সহকারীকে ‘হিরো’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তরবঙ্গের বনাঞ্চল, বিশেষ করে চাপরামারি, গরুমারা, জলদাপাড়া—এসব এলাকার মধ্য দিয়ে যেহেতু রেললাইন গিয়েছে, তাই প্রায়ই বন্যপ্রাণী, বিশেষ করে হাতিদের মৃত্যুর খবর শোনা যায়। ২০১৩ সালে জলদাপাড়ার কাছে একটি ট্রেন দুর্ঘটনায় একসঙ্গে ৭টি হাতির মৃত্যু হয়েছিল, যা বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়। তার পর থেকে রেল ও বনদপ্তর একসঙ্গে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যেমন, ট্রেনের গতিবেগ কমানো, বন দফতরের টহল, ট্র্যাকের পাশে সিসিটিভি লাগানো ইত্যাদি। তবে এসব সত্ত্বেও মাঝে মাঝেই হাতিদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। তাই এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে একটি বড় শিক্ষা আবারও সামনে এলো—প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, মানুষের সতর্কতা আর মানবিকতা যদি থাকে, তাহলে অনেক প্রাণই বাঁচানো সম্ভব।এই প্রসঙ্গে বনদপ্তরের এক কর্তা বলেন, “চালকেরা যদি সচেতন না হতেন তাহলে আজ ফের একটি দুর্ঘটনার খবর লিখতে হত। আমাদের পক্ষ থেকেও চেষ্টা চলবে যাতে এমন পরিস্থিতি এড়ানো যায়। বিশেষ করে হাতিদের চলাচলের সময় ট্রেন চলাচল আরও সাবধানে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।”
অন্যদিকে স্থানীয় মানুষদের মধ্যেও স্বস্তির নিঃশ্বাস। কারণ, এই জঙ্গলের হাতিরাই এদের নিত্যদিনের প্রতিবেশী। গ্রামবাসীদের অনেকেই জানিয়েছেন, হাতিদের প্রতি এই ধরনের মানবিক আচরণ তাদের গর্বিত করেছে। স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, “আমরা প্রতিদিন শুনি হাতির মৃত্যু খবর, কিন্তু আজ দেখলাম মানুষও চাইলে বনজঙ্গলের প্রাণীদের রক্ষা করতে পারে। এই কাজ চালকদের সত্যিই স্যালুট।”ঘটনার তাৎপর্য শুধু এই নয় যে একটি মা হাতি ও তার শাবক বেঁচে গেল। এর মধ্য দিয়ে আবারও প্রমাণ হলো ভারতীয় রেলকর্মীদের সতর্কতা ও দায়িত্ববোধ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, এ ঘটনা ভবিষ্যতের জন্য এক বড় শিক্ষা। বিশেষ করে নীতি নির্ধারকদের জন্য—রেললাইন নির্মাণ বা ট্রেন চলাচলের সময় বন্যপ্রাণীদের পথের কথা আরও বেশি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, হাতিরা মূলত অভ্যাসগত প্রাণী। তারা যে পথে বছরের পর বছর চলাফেরা করে, সেই পথ হঠাৎ করে ট্রেনলাইনে কেটে গেলে সমস্যার সৃষ্টি হয়। ফলে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রেললাইন বরাবর ‘আন্ডারপাস’ বা ‘ওভারপাস’ তৈরি করা গেলে দুর্ঘটনা আরও কমানো সম্ভব।

এদিকে পরিবেশপ্রেমীরা মনে করছেন, শুধু উত্তরবঙ্গ নয়, আসাম, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, কেরালা সহ দেশের বহু জায়গায় হাতি মারা পড়ছে ট্রেনে। তাই সর্বভারতীয় স্তরে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া দরকার। ভারত সরকার ইতিমধ্যেই ‘গজ অভিযান’ শুরু করেছে হাতি সংরক্ষণের জন্য। এই ঘটনার পর সেটিকে আরও শক্তিশালী করার দাবি উঠছে।অন্যদিকে যাত্রীরা যারা সেই রাতের ঘটনায় উপস্থিত ছিলেন, তাদের অনেকেই বলেছেন, “প্রথমে ট্রেন থেমে যাওয়ায় বিরক্তি হচ্ছিল। কিন্তু যখন দেখলাম মা হাতি আর শাবককে, তখন বুক ভরে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল এটাই সত্যি মানবিকতার জয়।”শেষ পর্যন্ত বলা যায়, রেললাইনে হাতি-শাবকের এই উপস্থিতি যেমন বড়সড় দুর্ঘটনার ইঙ্গিত দিচ্ছিল, তেমনই চালকের দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং মানবিকতা জীবন বাঁচিয়েছে। এই ঘটনা শুধু একটি রাতের কাহিনি নয়, বরং আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষ আর প্রকৃতি পাশাপাশি চলার জন্যই তৈরি। ট্রেনের শব্দ থেমে গিয়েছিল, আর মায়ের ডাকে শাবক এগিয়ে যাচ্ছিল। সেই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করা সকলের মনেই চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।