DVC releases water again, warning issued in riverside areas: দামোদর উপত্যকার মানুষদের কাছে ‘ডিভিসি’ বা দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্যই পরিচিত নয়, বরং বর্ষা এলেই বন্যার আশঙ্কার সঙ্গেও এর নাম জড়িয়ে যায়। প্রতি বছর বর্ষাকালে মাইথন ও পাঞ্চেত জলাধারের জলস্তর বেড়ে গেলে জল ছাড়তে বাধ্য হয় ডিভিসি, আর তাতেই নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে ভয় বাড়ে। এবারও ব্যতিক্রম ঘটল না। গত কয়েকদিনের ধারাবাহিক বৃষ্টির জেরে ড্যাম ভরে উঠতে শুরু করায় প্রশাসনের নির্দেশে ফের ছাড়া হল বিপুল পরিমাণ জল।
ডিভিসি সূত্রে জানা গেছে, শনিবার থেকে একসঙ্গে জল ছাড়া শুরু হয়েছে মাইথন ও পাঞ্চেত জলাধার থেকে। মোট ৫৮ হাজার ৫২৮ কিউসেক জল ছাড়া হয়েছে দুই জলাধার মিলিয়ে। এর মধ্যে মাইথন জলাধার থেকে ৩১ হাজার ৮৪০ কিউসেক এবং পাঞ্চেত থেকে ২৬ হাজার ৬৮৮ কিউসেক জল ছাড়া হয়েছে।
প্রবল বর্ষণের ফলে উভয় জলাধারের জলস্তর দ্রুত বাড়ছিল। জলাধারের সুরক্ষা ও আশেপাশের বাঁধের চাপ নিয়ন্ত্রণ করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে ডিভিসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। তবে এর ফলে দামোদর ও তৎসংলগ্ন নদীগুলির জলের প্রবাহ আচমকা বৃদ্ধি পেতে পারে। নিচু এলাকাগুলিতে জল ঢুকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই নদীতীরবর্তী ও নিম্নাঞ্চলগুলিতে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলিতে মাইকিং করে মানুষকে সতর্ক করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে সরে যেতে বলা হয়েছে। বিপর্যয় মোকাবিলা দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
এক প্রশাসনিক আধিকারিক বলেন, “আমরা পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছি। কোথাও জল ঢোকার খবর পেলে দ্রুত ত্রাণ ও উদ্ধার কাজ শুরু হবে।”

পান্ডবেশ্বরের এক গ্রামবাসী বলেন, “বর্ষা এলেই এই ভয় আমাদের তাড়া করে। একদিকে বৃষ্টি, অন্যদিকে ডিভিসির জল—দুটো মিলিয়ে ঘরে জল ঢুকে পড়ে। এবারও মনে হচ্ছে আমাদের সরে যেতে হবে।”
দুর্গাপুরের কাছে নদীর পাড়ে বাস করা আরেক বাসিন্দার কথায়, “জল ছাড়ার খবর পেলেই রাত জেগে আমরা নদীর দিকে নজর রাখি। কখন যে পানি এসে বাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যাবে, বলা যায় না।”ডিভিসি-র জলছাড়া একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া হলেও তার প্রভাব নদীতীরবর্তী মানুষের জীবনে গভীর। বিশেষত বর্ষায়, যখন বৃষ্টির কারণে নদীর জলস্তর ইতিমধ্যেই উঁচুতে থাকে, তখন অতিরিক্ত জল ছাড়া নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
দামোদর নদী ঐতিহাসিকভাবে ‘বাঙলার দুঃখ’ নামে পরিচিত ছিল। ডিভিসি তৈরির মূল উদ্দেশ্যই ছিল বন্যা নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু জলাধারে নির্দিষ্ট সীমার বেশি জল জমা হলে বাধ্যতামূলকভাবে জল ছাড়তেই হয়, যা প্রায়ই অপ্রত্যাশিত বন্যার পরিস্থিতি তৈরি করে।

বৃষ্টিপাতের ধারা যদি অব্যাহত থাকে, তবে আরও জল ছাড়তে হতে পারে ডিভিসিকে। ফলে সতর্ক অবস্থায় থাকতে হবে নদীর তীরবর্তী অঞ্চলগুলিকে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত আবহাওয়া দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে জলস্তরের হালনাগাদ তথ্য দেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই সমস্যার সমাধান করতে হলে জলাধারগুলির ব্যবস্থাপনা আরও আধুনিক করা এবং বিকল্প জলপ্রবাহের পথ তৈরি করা জরুরি।প্রকৃতি ও মানুষের লড়াই আবারও নতুন করে শুরু হয়েছে দামোদর উপত্যকায়। ডিভিসি-র জলছাড়া হয়তো অবশ্যম্ভাবী, কিন্তু তার প্রভাব সামলাতে প্রশাসন ও স্থানীয় মানুষের সমন্বয়ই একমাত্র ভরসা। আপাতত নদীতীরবর্তী এলাকায় সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে এবং প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলতে হবে—কারণ সতর্কতাই পারে সম্ভাব্য বিপদকে অনেকটা কমিয়ে দিতে।