Dr. Janmachandra Roy’s birth and death celebrated in Asansol : মঙ্গলবারের সকালটা যেন ছিল এক অন্যরকম আবেগে মোড়া, আসানসোলের মহিশিলা বটতলা বাজার এলাকার বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল শ্রদ্ধা, সম্মান আর কৃতজ্ঞতার মিশ্র সুর। এই দিনটি ছিল একজন অসামান্য মানুষ, একাধারে চিকিৎসক, স্বাধীনতা সংগ্রামী, কংগ্রেস নেতা, পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এবং আধুনিক কলকাতা ও বাংলার রূপকার ড. বিধানচন্দ্র রায়ের জন্ম ও প্রয়াণ দিবস—যিনি ১৮৮২ সালের ১লা জুলাই জন্মগ্রহণ করে ঠিক একই দিনে ১৯৬২ সালে প্রয়াণ করেন। বাংলার ইতিহাসে এমন মুষ্টিমেয় মানুষ আছেন যাঁদের সম্পর্কে বলতে গেলে শুধু পদ বা পরিচয় দিয়ে বোঝানো যায় না, ড. রায় তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। এই বিশেষ দিনটিকে স্মরণ করতে আসানসোল পৌর নিগম এক অনন্য আয়োজন করে মহিশিলা বটতলা বাজার চত্বরে, যেখানে ড. রায়ের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন আসানসোল পৌর নিগমের চেয়ারম্যান অমরনাথ চট্টোপাধ্যায়, এমএমআইসি তথা কাউন্সিলর মানস দাস সহ আরও বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি।
মাল্যদানের পর শুরু হয় স্মৃতিচারণা, যেখানে বক্তারা তুলে ধরেন ড. রায়ের সেবার মনোভাব, মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও এক আদর্শ নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত। চেয়ারম্যান অমরনাথ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “ড. বিধানচন্দ্র রায় কেবল একজন চিকিৎসক বা রাজনীতিবিদ নন, তিনি একজন মানবিক পথপ্রদর্শক ছিলেন, যিনি গোটা বাংলা তথা ভারতের চিকিৎসা ও প্রশাসনের মানচিত্র পালটে দিয়েছিলেন।” কাউন্সিলর মানস দাস স্মরণ করিয়ে দেন, “ড. রায় যতটা সফল প্রশাসক ছিলেন, ততটাই ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসক। তাঁর গড়ে তোলা কলকাতা মেডিকেল কলেজ, চিত্তরঞ্জন ক্যান্সার হাসপাতাল, কিংবা আইপিজিএমইআরের মতো প্রতিষ্ঠান আজও বাংলার গর্ব।”
অনুষ্ঠানটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে স্থানীয় ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত একটি ছোট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যেখানে আবৃত্তি, গান ও বক্তৃতার মাধ্যমে তারা তুলে ধরে ড. রায়ের জীবনী। এই আয়োজনে শিশুদের উৎসাহ ও অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো, যা প্রমাণ করে নতুন প্রজন্মের মধ্যেও ইতিহাস জানার ও গর্ব করার আগ্রহ কতটা প্রবল। ড. বিধানচন্দ্র রায় ১৯৪৮ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত টানা মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন এবং তাঁর শাসনকালেই পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং নগরোন্নয়ন এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। কলকাতা, দুর্গাপুর, কাঞ্চনজঙ্ঘা হাউজিং প্রকল্প, অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস, নেতাজি ভবন প্রভৃতি উন্নয়ন তাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যখন দেশ গঠন এবং পুনর্গঠনের কঠিন কাজ চলছিল, তখন তিনি একজন নীরব স্থপতির মতো বাংলা ও ভারতের জন্য কাজ করে গেছেন। চিকিৎসার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন একজন কিংবদন্তি; একজন রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসা করে তিনিই দেখিয়েছিলেন কীভাবে নিঃস্বার্থ সেবা মানুষের অন্তরে জায়গা করে নেয়। এমনকি, ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুও একবার বলেছিলেন,
“Dr. B. C. Roy combines in himself the qualities of a great doctor, a true patriot, and a constructive administrator.” ড. রায়ের স্মরণে ভারতের চিকিৎসক সমাজ প্রতি বছর ১লা জুলাই ‘ডক্টরস ডে’ পালন করে—এমন সম্মান খুব কম মানুষই পান। আসানসোলের এই অনুষ্ঠানে স্থানীয় নাগরিকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকেই বললেন, বর্তমান সমাজে এমন আদর্শ মানুষদের স্মরণ করাটা অত্যন্ত প্রয়োজন, যাতে নতুন প্রজন্ম জানে দেশের গঠনের পিছনে কত মানুষের ত্যাগ ও সাধনা রয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী সঞ্জয় পাল জানান, “আজকের দিনে যখন রাজনীতি আর ব্যক্তিস্বার্থ ঘিরে চলছে, তখন ড. রায়ের মতো ব্যক্তিত্বদের কথা মনে করাটা আমাদের দায়িত্ব।” শিক্ষিকা রিমা মুখার্জী বললেন, “এই ধরনের অনুষ্ঠান নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস জানতে শেখায়। ওরা জানে না বলেই তো ভুল পথে যাচ্ছে, আমরা যদি ড. রায়ের মতো ব্যক্তিত্বদের জীবনকে তুলে ধরতে পারি, তবে কিছুটা হলেও পরিবর্তন আসবে।” ভবিষ্যতের দিক থেকে ভাবলে, এমন আয়োজন কেবল স্মরণসভা হয়ে না থেকে যদি স্থানীয় স্কুলে বা কলেজে শিক্ষামূলক কর্মশালার আয়োজন করা হয়, তাহলে হয়তো ড. রায়ের আদর্শকে বাস্তবে প্রয়োগ করার পথ আরও সুদৃঢ় হবে। আসানসোলের মতো শিল্প শহরে যেখানে চিকিৎসা ও শিক্ষা পরিষেবার আরও প্রসার দরকার, সেখানে তাঁর মত চিন্তাবিদদের দর্শন আরও বেশি করে প্রয়োজন।
এমনকি আসানসোল পৌর নিগম যদি তাঁর নামে স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পাঠাগার বা স্মারক সংগ্রহশালার মতো কিছু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়, তাহলে শুধু স্মৃতি রক্ষাই নয়, ভবিষ্যতের দিশাও দেখানো হবে। অনুষ্ঠান শেষ হয় এক মিলনসন্ধ্যার মাধ্যমে, যেখানে অতিথিরা একত্রে বসে আলোচনা করেন কীভাবে সমাজের মধ্যে মানবিকতা, সেবা ও আদর্শিক নেতৃত্বকে ফিরিয়ে আনা যায়। এই একদিনের শ্রদ্ধা নিবেদন যেন অনেকটাই জ্বালিয়ে দিল এক নতুন আশার আলো—যেখানে রাজনীতি শুধু ক্ষমতা নয়, তা সেবার একটি মাধ্যম, আর চিকিৎসা শুধু পেশা নয়, তা মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানোর এক সেতু। আসানসোলের মানুষেরা এদিন বুঝিয়ে দিলেন, ইতিহাস মনে রাখার মতো, ইতিহাস থেকে শেখারও আছে অনেক কিছু।