Cyclone in Bay of Bengal, heavy rain and sea warning issued in the state:-নতুন করে বঙ্গোপসাগরের উপর আবারও ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হয়েছে, আর তার জেরে সমগ্র রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে এক অস্থির আবহাওয়া, যেন প্রকৃতিই মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বারবার কড়া নাড়ছে। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস বলছে, গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ থেকে উড়িষ্যা উপকূল জুড়ে এই ঘূর্ণাবর্তের প্রভাবে তৈরি হবে নিম্নচাপ, যার জেরে সমুদ্র উত্তাল হয়ে উঠবে এবং ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করবে। এর ফলে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে না যাওয়ার কড়া নির্দেশ জারি করা হয়েছে। এই খবরে উপকূলবর্তী এলাকার মানুষদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়েছে, বিশেষ করে যেসব পরিবার জীবিকা নির্বাহ করেন মাছ ধরার উপর নির্ভর করে, তাদের অবস্থা সবচেয়ে বেশি সঙ্কটজনক। পূর্ব মেদিনীপুরের দিঘা, শংকরপুর, তাজপুর কিংবা দক্ষিণ ২৪ পরগনার কাকদ্বীপ, নামখানা, ফ্রেজারগঞ্জের মতো এলাকায় হাজার হাজার মৎস্যজীবীর চোখ এখন আকাশের দিকে, কারণ তারা জানে সমুদ্র উত্তাল হলে এক দিনের মাছ ধরতে না পারা মানেই পেটে টান পড়বে। এক স্থানীয় মৎস্যজীবী গোপাল দাস জানালেন—

“আমরা জানি বিপদের সময় সমুদ্রে নামা উচিত নয়, কিন্তু যদি টানা কয়েকদিন বৃষ্টি আর ঝড়ো হাওয়া থাকে, তাহলে সংসার চালানোই দায় হয়ে যাবে।” শুধু উপকূল নয়, সারা রাজ্যেই এই ঘূর্ণাবর্তের প্রভাবে প্রায় প্রতিটি জেলায় আগামী সোমবার পর্যন্ত বিক্ষিপ্তভাবে ভারী বৃষ্টি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বজ্রবিদ্যুৎসহ হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, নদিয়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার বহু জায়গায়, আর আবহাওয়া দপ্তর জানাচ্ছে দক্ষিণবঙ্গে বিশেষ করে পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, পূর্ব বর্ধমান জেলায় ভারী বৃষ্টির সতর্কতা রয়েছে। উত্তরের পরিস্থিতিও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়—দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, মালদহ, দুই দিনাজপুর—সবকটি জেলায়ই আগামী কয়েকদিন ধরে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস জারি হয়েছে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ প্রায় ৯৪ থেকে ৯৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, ফলে গরমের সঙ্গে আর্দ্রতার ঘনঘটা মিলিয়ে মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। কলকাতার রাস্তাঘাটে ইতিমধ্যেই জল জমতে শুরু করেছে, যেটা নিয়ে নিত্যযাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ছে। কলেজ স্ট্রিটের বই ব্যবসায়ী বলছিলেন—“প্রতিবারই একটু ভারী বৃষ্টি হলেই জল জমে যায়, এবারও একই অবস্থা। দোকান বাঁচাব নাকি বাড়ি ফিরব বুঝতে পারি না।
” অন্যদিকে সাধারণ মানুষ ভাবছেন, এই টানা বৃষ্টি যদি আরও বাড়ে তবে গ্রামীণ এলাকায় জমি চাষে কিছুটা সুবিধা হলেও শহরে অচলাবস্থা তৈরি হবে। খেটে খাওয়া মানুষ থেকে ব্যবসায়ী—সবাই এখন ভুগছেন বৃষ্টির অতিরিক্ত দাপটে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের ঘূর্ণাবর্ত এবং নিম্নচাপ বঙ্গোপসাগরে প্রায় প্রতি বছরই তৈরি হয়, তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন এগুলির প্রকোপ এবং প্রভাব অনেক বেশি। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, সময় মতো বৃষ্টি ধানচাষের পক্ষে ভালো হলেও যদি জলাবদ্ধতা হয়, তবে তা চাষের ক্ষতি করতে পারে। আবার স্বাস্থ্য দপ্তরের তরফে ইতিমধ্যেই সতর্কতা জারি হয়েছে, কারণ টানা বৃষ্টির ফলে ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়ার মতো রোগ বাড়তে পারে। উপকূলবর্তী এলাকায় নদীভাঙন এবং বাঁধ ভেঙে জল ঢোকার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তাই স্থানীয় প্রশাসন সর্বদা তৎপর রয়েছে। এক বনগাঁর বাসিন্দা বললেন—“বৃষ্টি আমরা চাই, কারণ চাষের জন্য দরকার। কিন্তু এত ঝড়ো হাওয়া, বজ্রপাত, বন্যার ভয়—এসব নিয়ে ঘুমাতে পারি না।

” কলকাতার ক্ষেত্রে শুক্রবার ন্যূনতম তাপমাত্রা ২৬.২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে এসেছে, আর সর্বোচ্চ ২৯ ডিগ্রির আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। এর মানে দাঁড়াচ্ছে, দিনভর অস্বস্তি আর রাতভর ঘুমহীনতা। শহর থেকে গ্রাম, মৎস্যজীবী থেকে কৃষক—সবাই এখন এক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। আবহাওয়া দপ্তরের এক আধিকারিক জানালেন—“এই ঘূর্ণাবর্তের প্রভাব ২৩ আগস্ট পর্যন্ত থাকবে, তাই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে, বিশেষ করে সমুদ্রে যেতে সম্পূর্ণ নিষেধ।” ভবিষ্যতের দিক থেকে দেখতে গেলে, বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগামী দিনে এই ধরনের ঘূর্ণাবর্ত আরও ঘনঘন দেখা দেবে, যার ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়বে, আর অর্থনীতির উপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই এখনই এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি, নইলে আগামী প্রজন্মকে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। রাজ্যের মানুষ আজ একটাই প্রার্থনা করছেন—প্রকৃতির এই রুদ্র রূপ যেন দ্রুত শান্ত হয়, আর জীবন ফের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসে।