China’s sarcasm at Trump, Beijing stands by India:আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চিন—এই তিনটি দেশের সম্পর্ক বরাবরই বহুস্তরীয় ও জটিল। একদিকে অর্থনৈতিক স্বার্থ, অন্যদিকে ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব—এই দুইয়ের টানাপোড়েনের মধ্যেই নানা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতি ক্রমশ আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ স্লোগানকে সামনে রেখে ট্রাম্প প্রশাসন বারবার শুল্ক বৃদ্ধি করে বিদেশি পণ্যের উপর চাপ বাড়িয়েছে।ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সম্পর্ক বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ হলেও, পারস্পরিক চুক্তি বাস্তবায়নের পথে নানা জটিলতা রয়েছে। এর মধ্যেই রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি নিয়ে ওয়াশিংটনের অসন্তোষ আরও বেড়ে যায়। আর এই প্রেক্ষাপটেই ঘটে গেল এমন এক কূটনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, যা অনেককেই অবাক করেছে—ভারতের পাশে এসে দাঁড়াল বেজিং, আর সরাসরি ট্রাম্পকে কটাক্ষ করলেন নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত চিনা রাষ্ট্রদূত জু ফেইহং।সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষণা করে, ভারতীয় পণ্যের উপর প্রথমে ২৫ শতাংশ শুল্ক বসানো হবে। কিন্তু সেখানেই শেষ নয়—২৪ ঘণ্টার মধ্যে সেই হার দ্বিগুণ করে দেওয়া হয়। অর্থাৎ, এখন থেকে আমেরিকায় ভারতীয় পণ্য রপ্তানি করতে হলে মোট ৫০ শতাংশ আমদানি শুল্ক দিতে হবে।ট্রাম্প নিজেই বলেন, “রাশিয়া থেকে ভারত তেল আমদানি করছে, আর তাই ‘শাস্তিমূলক কর’ বসানো হচ্ছে।” একইসঙ্গে তিনি অভিযোগ তোলেন, ভারত যথেষ্ট পরিমাণে আমেরিকান পণ্য আমদানি করছে না, অথচ আমেরিকা ভারতের কাছ থেকে প্রচুর পণ্য কিনছে।এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে হঠাৎ করেই সক্রিয় হয়ে ওঠে চিন। নয়াদিল্লিতে চিনা রাষ্ট্রদূত জু ফেইহং এক বিবৃতিতে ট্রাম্পকে কার্যত ‘মস্তান’ বলে আক্রমণ করেন।
তাঁর কথায়, “শুল্ককে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে অন্য দেশগুলিকে অবদমন করতে চাইলে তা রাষ্ট্রসংঘের বাণিজ্য নীতির পরিপন্থী। এই পথ কখনও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।”উল্লেখযোগ্যভাবে, আমেরিকা ইতিমধ্যেই চিন ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করেছে। বর্তমানে চিনা পণ্যের উপর ৩০ শতাংশ এবং পাকিস্তানি পণ্যের উপর ১৯ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়েছে। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে এই হার ৫০ শতাংশ—যা স্পষ্টতই অনেক বেশি।ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রক এই শুল্ক বৃদ্ধিকে ‘অন্যায্য ও একতরফা’ বলে বর্ণনা করেছে। সরকার জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিয়ম মেনে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (WTO) আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়েরের কথা ভাবছে।একইসঙ্গে নয়াদিল্লি কূটনৈতিক পথে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে, যাতে পরিস্থিতি দ্রুত সমাধান হয়। তবে চিনের এই প্রকাশ্য সমর্থন নিয়ে সরকারি মহল আপাতত সরাসরি কোনও মন্তব্য করেনি, যদিও বিদেশ মন্ত্রকের অভ্যন্তরে এটিকে কূটনৈতিক ‘সুবর্ণ সুযোগ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।দেশের ব্যবসায়ী মহল এই সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

দিল্লির এক রপ্তানিকারক বলেন, “৫০ শতাংশ শুল্ক মানে হল আমেরিকার বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রতিযোগিতা ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যাবে। অনেক চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে।”তামিলনাড়ুর এক টেক্সটাইল শিল্পপতি জানান, “আমেরিকা আমাদের অন্যতম বড় ক্রেতা। এই শুল্ক বাড়লে রপ্তানি ব্যবসা মুখ থুবড়ে পড়বে।”সোশ্যাল মিডিয়াতেও এই বিষয় নিয়ে সরব হয়েছেন বহু সাধারণ মানুষ। কেউ ট্রাম্পের নীতিকে ‘বাণিজ্য সন্ত্রাস’ বলছেন, আবার কেউ প্রশ্ন তুলছেন—আমেরিকা কি সত্যিই ভারতের দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক বন্ধু?ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত মূলত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের মিশ্রণ। রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি নিয়ে আমেরিকার অসন্তোষ বহুদিনের। সেই সঙ্গে ট্রাম্প নিজ দেশের শিল্প রক্ষার যুক্তি দেখিয়ে বিদেশি পণ্যের উপর শুল্ক বাড়াচ্ছেন। কিন্তু ৫০ শতাংশ শুল্ক একটি স্পষ্ট বার্তা—ভারতকে চাপে রাখা।চিনের প্রতিক্রিয়াটি এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারত ও চিন প্রায়শই একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও, এই ঘটনায় বেজিংয়ের সমর্থন এক ধরনের কূটনৈতিক পালাবদল নির্দেশ করছে। এটি একদিকে ভারতের জন্য একটি কূটনৈতিক হাতিয়ার, অন্যদিকে মার্কিন-চিন সম্পর্কের নতুন সমীকরণকেও সামনে আনছে।এছাড়া, এই সিদ্ধান্ত ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য এক বড় ধাক্কা। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের অন্যতম বৃহত্তম রপ্তানি বাজার—এখানে প্রতিযোগিতা হারালে দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব পড়তে বাধ্য।