Center’s strict stance on harmful real-money gaming services : ভারতে অনলাইন গেমিং শিল্প গত এক দশকে এক বিরাট রূপান্তরের সাক্ষী হয়েছে। স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা, সস্তা ডেটা পরিষেবা এবং তরুণ প্রজন্মের আগ্রহের কারণে এই খাতটি দ্রুত বাড়তে থাকে। শুধু বিনোদন নয়, ফ্যান্টাসি ক্রিকেট, রামি বা পোকারের মতো রিয়েল-মানি গেম (Real Money Games) মানুষের মধ্যে নতুন ধরণের ‘আয়ের সুযোগ’ হিসেবে জনপ্রিয়তা পায়। কোটি কোটি টাকা ঘোরাফেরা করতে শুরু করে এই ভার্চুয়াল টেবিলে। ফলে একদিকে বিনিয়োগকারীরা যেমন ভারতের বাজারে ঢল নামাতে থাকেন, অন্যদিকে সমাজে তৈরি হতে থাকে নানা প্রশ্ন—আসক্তি, আর্থিক ক্ষতি, মানসিক চাপ ও পরিবার ভাঙনের মতো অন্ধকার দিক নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে।এই প্রেক্ষাপটেই কেন্দ্রীয় সরকার অনলাইন গেমিং বিল, ২০২৫ নিয়ে আসে। যার মূল লক্ষ্য ক্ষতিকারক অর্থভিত্তিক গেমগুলিকে নিয়ন্ত্রণে আনা, আর্থিক জুয়াখেলাকে ঠেকানো এবং সমাজে এর নেতিবাচক প্রভাব কমানো।
বুধবার লোকসভায় কোনো বিতর্ক ছাড়াই পাস হয়ে যায় অনলাইন গেমিং বিল, ২০২৫। বিরোধী সদস্যরা তখন বিহারে ভোটের তালিকা সংশোধন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকায় আলোচনার দাবিতে স্লোগান তুলছিলেন। ফলে গেমিং বিলটি কার্যত কোনো আপত্তি ছাড়াই পাশ হয়ে যায়।পরদিন বৃহস্পতিবার রাজ্যসভায়ও বিলটি অনুমোদন পায়। এর মাধ্যমে dream11, পোকার, রামি কিংবা অন্যান্য অর্থভিত্তিক ফ্যান্টাসি অ্যাপগুলির কার্যক্রম এখন কার্যত নিষিদ্ধ। সরকারের ভাষ্য—এমন গেম মানুষকে ভ্রান্ত প্রলোভনে ফেলছে। অনেকেই একদিকে চাকরি, পড়াশোনা কিংবা ব্যবসা ছেড়ে পুরোপুরি ডুবে যাচ্ছেন এই গেমে, অন্যদিকে হাজার হাজার মানুষ ঋণে জর্জরিত হচ্ছেন।এই বিল অনুযায়ী কেবল গেম খেলা নয়, এমন অ্যাপের বিজ্ঞাপন, আর্থিক লেনদেন বা প্রচার সবই বেআইনি বলে গণ্য হবে।

কেন্দ্রীয় সরকারের যুক্তি একেবারেই পরিষ্কার—ভারতের তরুণ প্রজন্মকে আর্থিক ক্ষতি ও মানসিক যন্ত্রণা থেকে রক্ষা করতেই এই সিদ্ধান্ত। তথ্যপ্রযুক্তি দফতরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, “অনলাইন রিয়েল-মানি গেমিং কোনো বিনোদন নয়, এটি প্রলোভনের ফাঁদ। দেশের যুবসমাজকে সুস্থ রাখার জন্য কঠোর পদক্ষেপ জরুরি।”সরকার আরও দাবি করেছে, জুয়াখেলার মতো এই গেমগুলো সমাজের বুনোট নষ্ট করছে। ছোট ছোট পরিবারে ভাঙন ধরছে। ফলে আইন প্রণয়নের ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।

বিলটি নিয়ে মানুষের প্রতিক্রিয়া মিশ্র। অনেক বাবা-মা ও পরিবার এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য—“আমাদের ছেলেমেয়েরা রাতভর মোবাইল স্ক্রিনে ডুবে থাকত। পড়াশোনায় মন বসত না, টাকাও হারাচ্ছিল। সরকার সঠিক কাজ করেছে।”আবার, যাঁরা গেমিং শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বা এই খাত থেকে কর্মসংস্থান পেয়েছিলেন, তাঁদের মনে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। কলকাতার এক তরুণ ফ্যান্টাসি অ্যাপ ডেভেলপার বলেন, “আমরা এই খাতে চাকরি পেয়েছিলাম। এখন সব বন্ধ হয়ে গেলে হাজার হাজার মানুষ বেকার হয়ে পড়বে।”

ভারতের অনলাইন গেমিং শিল্প বর্তমানে প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের। বিনিয়োগকারীদের কাছে ভারত ছিল এক অন্যতম সম্ভাবনাময় বাজার। ড্রিম ১১, গেমস ২৪*৭, মোবাইল প্রিমিয়ার লিগের মতো বড় প্ল্যাটফর্মগুলো দেশের ভেতরে কর্মসংস্থান তৈরি করেছিল। সেই জায়গায় এই বিল নিঃসন্দেহে শিল্পের জন্য এক বড় ধাক্কা।তবে সামাজিক প্রভাবের কথা ভাবলে সরকারের পদক্ষেপকে হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। গবেষণায় দেখা গেছে, অনলাইন রিয়েল-মানি গেমে আসক্তির ফলে বহু তরুণ ঋণে জড়িয়ে পড়েছেন, পরিবারের মধ্যে দ্বন্দ্ব বেড়েছে, এমনকি আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। তাই অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্ভাবনা থাকলেও সরকারের কাছে জনস্বার্থই মুখ্য হয়ে উঠেছে।

এই বিল পাস হওয়ার পর ভারতের গেমিং শিল্প নতুন করে দিক খুঁজতে বাধ্য হবে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এখন গেমিং কোম্পানিগুলোকে ফ্রি-টু-প্লে (Free-to-play) বা শুধুমাত্র বিনোদনমূলক গেমে ফোকাস করতে হবে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরাও হয়তো আপাতত সতর্ক হবেন।তবে এর ফলে দেশে নতুন নীতি-আলোচনা শুরু হয়েছে—বিনোদন আর জুয়া, এই দুইয়ের মধ্যে সীমানা কোথায়? ভবিষ্যতে সরকার কি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ফ্যান্টাসি স্পোর্টসকে অনুমোদন দেবে? না কি এ খাত পুরোপুরি বন্ধই থাকবে? উত্তর সময়ই দেবে।

ক্ষতিকারক রিয়েল-মানি গেমিং পরিষেবার বিরুদ্ধে কেন্দ্রের এই পদক্ষেপ একদিকে যেমন তরুণ সমাজকে রক্ষা করার প্রচেষ্টা, অন্যদিকে তা ভারতের গেমিং শিল্পকে এক বড় ধাক্কা দিয়েছে। এটি নিছক একটি বিল নয়, বরং দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এখন দেখার বিষয়, এই পরিবর্তনের সঙ্গে ভারতীয় বাজার কত দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারে।