Bengali translation alternative voice Prosenjit, Dev : “নিজের ঘরেই পর, নিজের ভাষাতেই বঞ্চিত”—এই কথাটি শুনলে হয়তো মনে হবে, কেউ কষ্ট পেয়ে গিয়েছে ব্যক্তিগত জীবনে, কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই কথাটিই আজ বাস্তব হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের বাংলা সিনেমার ক্ষেত্রে, নিজের রাজ্যের প্রেক্ষাগৃহেই যেন আজ পরবাসী বাংলা ছবি, আর এই অপমান, এই অবহেলার বিরুদ্ধে এখন গর্জে উঠেছে টলিউড, গর্জে উঠেছেন বাংলা চলচ্চিত্রের দুই মহাতারকা প্রসেনজিত্ চট্টোপাধ্যায় ও দেব সহ একঝাঁক পরিচালক, প্রযোজক ও অভিনেতারা, কারণ সামনে আগস্টে মুক্তি পাচ্ছে হিন্দি ছবির দানবীয় বাজেটের ‘ওয়ার ২’, আর একই সঙ্গে মুক্তি পাচ্ছে বহু প্রতীক্ষিত বাংলা ছবি ‘ধূমকেতু’, যেখানে মুখ্য ভূমিকায় দেব, কিন্তু দুঃখজনকভাবে ইতিমধ্যেই জানা যাচ্ছে, বহু প্রেক্ষাগৃহে প্রাইম টাইম শো দেওয়া হচ্ছে না ‘ধূমকেতু’কে, বরং সেই জায়গা চলে যাচ্ছে বলিউডের ছবির দখলে, আর এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই ৬ জন টলিউড তারকা ও নির্মাতা—প্রসেনজিত্, দেব, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, সৃজিত মুখোপাধ্যায়, প্রযোজক শ্রীকান্ত মোহতা ও নিশপাল সিং রানে—একযোগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন, যাতে বাংলা ছবিকে প্রাইম টাইমে জায়গা দেওয়া হয় বাধ্যতামূলকভাবে, কারণ এ শুধু একটা ছবি রিলিজের লড়াই নয়, এ এক ভাষার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই, নিজেদের সংস্কৃতি, শিল্প ও পরিচয়ের অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ, চিঠিতে তাঁরা স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন, “বাংলা সিনেমার তরফ থেকে একপ্রকার ভাষা আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ এটা…
মহারাষ্ট্রে, পাঞ্জাবে বা দক্ষিণ ভারতে হিন্দি ছবির প্রযোজকরা এমন শর্ত দেওয়ার সাহস দেখান না, অথচ বাংলার সিনেমা হলে বাংলার ছবিকেই কোণঠাসা করা হচ্ছে,” এবং এখানেই চূড়ান্ত অন্যায়ের ছবি স্পষ্ট হয়, কারণ যদি তামিল, তেলুগু বা পাঞ্জাবি ছবিকে নিজের রাজ্যে প্রাধান্য দেওয়া হয়, তবে কেন বাংলায় বাংলা ছবির প্রাপ্য সম্মান নেই, কেনই বা একের পর এক প্রেক্ষাগৃহে বলিউডের ছবি চলে ফার্স্ট শো, সেকেন্ড শো ও সন্ধ্যার প্রাইম টাইমে, আর বাংলা ছবির ভাগ্যে থাকে দুপুর বা শেষ রাতের শো, প্রশ্ন তুলেছেন তারকারা, বিশেষত প্রসেনজিত্ বলেছেন, “এই বাংলা আমাদের, এই ভাষা আমাদের, বাংলা চলচ্চিত্র আমাদের গর্ব, আর বাংলা ছবি বাঁচাতে এবার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপই শেষ ভরসা,” উল্লেখ্য, প্রসেনজিত্ নিজে শুধু নায়ক নন, বাংলা সিনেমার একপ্রকার অভিভাবক, ৪ দশকেরও বেশি সময় ধরে একের পর এক হিট ছবি উপহার দিয়েছেন তিনি—‘অমরসঙ্গী’ থেকে ‘অটোগ্রাফ’, ‘জাতিস্মর’ থেকে ‘জুবিলি’—প্রতিটি ছবিই যেন বাংলার গল্পকে তুলে ধরেছে আন্তর্জাতিক পরিসরে, আর দেব, যিনি এখন বাংলা ছবির অন্যতম ব্যস্ত অভিনেতা ও সাংসদ, তিনিও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন,
“আমাদের সিনেমা বাঁচলে, আমাদের ভাষা বাঁচবে, আর যদি ভাষা হারিয়ে যায়, তবে তো জাতিও হারিয়ে যাবে একদিন,” বাস্তবের নিরিখে দেখলে, বাংলা সিনেমার দর্শক কমেনি, কিন্তু সুযোগ কমছে—মাল্টিপ্লেক্স বা সিঙ্গল স্ক্রিন, সর্বত্রই এখন হিন্দি বা দক্ষিণী ছবির একচেটিয়া দাপট, এমনকি পশ্চিমবঙ্গে সিনেমার স্ক্রিন সংখ্যা ৪০০-রও কম, যেখানে তামিলনাড়ুতে তা প্রায় ২০০০-এর কাছাকাছি, তাহলে বাংলা ছবি চলবে কোথায়, কে দেখবে, আর তারপরে সবাই বলবে বাংলা ছবি চলে না, বাংলা ইন্ডাস্ট্রি মরে যাচ্ছে, অথচ ঠিক এই ইন্ডাস্ট্রিই ‘পথের পাঁচালী’ দিয়েছে, ‘চোখের বালি’ দিয়েছে, ‘বেলাশেষে’ দিয়েছে—সেই ইন্ডাস্ট্রির এই দশা, কারণ কোনো সুরক্ষিত পরিবেশ নেই যেখানে বাংলা ছবি মুক্তি পাবে, চালানো হবে সম্মানের সঙ্গে, বর্তমান সংকটে পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায় বলছেন,
“এটা একটা ভাষার ওপর আক্রমণ, এটা শুধুই ইন্ডাস্ট্রির সমস্যা নয়, এটা সংস্কৃতির সমস্যা, এই মুহূর্তে যদি সরকার হস্তক্ষেপ না করে, তাহলে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেখাতে পারব না যে এক সময় এই বাংলায় সিনেমা ছিল,” তিনি যেমন ‘অটোগ্রাফ’, ‘জাতিস্মর’, ‘রাজকাহিনী’-র মতো ছবির মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক দর্শকের দরজায় পৌঁছে দিয়েছেন, সেই মানুষটিও আজ আশঙ্কায় ভুগছেন বাংলা ছবির ভবিষ্যৎ নিয়ে, শুধু শিল্পী মহলই নয়, সাধারণ মানুষও এখন উদ্বিগ্ন, কারণ বাংলা ছবি আমাদের জীবন, আমাদের গল্প, আমাদের চোখে দেখা সমাজের প্রতিচ্ছবি, যেটা বলিউড বা দক্ষিণী ছবি দিতে পারে না, এই সংকটে বাংলা সিনেমাকে বাঁচানোর জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত সচেতনতা, দরকার প্রশাসনিক সুরক্ষা, আর সবচেয়ে দরকার, আমাদের প্রত্যেকের ভালোবাসা ও সচেতন অংশগ্রহণ, কারণ যদি বাংলা ছবির ওপর আস্থা না থাকে, যদি আমরা নিজেরাই বলি—“ধুৎ, বাংলা ছবি দেখি না”—তবে তো হারানোর শেষ সময় এসে যাবে একদিন, ‘ধূমকেতু’ ছবির সঙ্গে সঙ্গে যেন আমাদের আশার আলোও উঁকি দিচ্ছে, হয়তো মুখ্যমন্ত্রী এ বিষয়ে কিছু বলবেন, হয়তো একটা নীতিমালা তৈরি হবে, যেখানে বাংলা ছবিকে প্রেক্ষাগৃহে সঠিক জায়গা দেওয়া হবে, কারণ বাংলা ছবি শুধু বিনোদন নয়, এটা আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির জীবন্ত দলিল,
এই লড়াইয়ে যে নামগুলো উঠে এসেছে তারা শুধু তারকা নন, তারা বাংলার সংস্কৃতির যোদ্ধা, যারা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এক অসম লড়াইয়ে, যেখানে প্রতিপক্ষ বহুগুণ শক্তিশালী, কিন্তু মাটি আর ভাষার টানে আজ তারা একজোট, এই ঘটনার প্রভাব শুধু সিনেমার জগতেই নয়, সমাজের প্রতিটি স্তরে পড়বে, স্কুলের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে গ্রামের বৃদ্ধ পর্যন্ত সবাই যেন আজ একটাই প্রশ্ন করছে—“আমরা কি নিজের ঘরেই নিজের ভাষার ছবি দেখতে পারব না?” বাংলার মানুষের এই মর্মবেদনা যেন আজ টলিউডের কান্নায় প্রতিফলিত হচ্ছে, এখন শুধু দেখার, প্রশাসন কীভাবে এই ভাষার অপমানের জবাব দেয়, আর আমরা, সাধারণ মানুষ, কীভাবে বাংলা ছবির পাশে দাঁড়াই, কারণ বাংলা সিনেমা মানেই বাংলা মাটি, বাংলা মানুষ, আর যদি এই সিনেমা হারিয়ে যায়, তবে হারিয়ে যাবে আমাদের নিজস্বতা, আমাদের হৃদয় থেকে উঠে আসা হাজার বছরের ইতিহাস, একটাই অনুরোধ—আপনার প্রিয় তারকাদের জন্য নয়, বাংলা ভাষার জন্য হলেও এবার হলে গিয়ে বাংলা ছবি দেখুন, নিজের সন্তানদের নিয়ে দেখুন, যাতে তারা জানে, এই বাংলা, এই ছবি, এই সংস্কৃতি—এটাই আমাদের পরিচয়, আমাদের গর্ব।