A herd of elephants has returned to the locality:-খাবারের খোঁজে বারবার জঙ্গল ছেড়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে বুনো হাতির দল, আর তার জেরে রাতভর আতঙ্কে কাটছে পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতা এলাকার গ্রামবাসীদের জীবন। সোমবার রাত প্রায় ১১টা নাগাদ বাঁকুড়া দিক থেকে ৪টি হাতি এসে ঢুকে পড়ে গড়বেতার গনগনি এলাকায়। প্রথমে তারা জঙ্গলের ধার ঘেঁষে ঘোরাফেরা করলেও কিছুক্ষণ পরেই ঢুকে পড়ে জনবসতিপূর্ণ এলাকায়। ভয়ে চিৎকার করে লোকজন ছুটোছুটি শুরু করে দেয়, বাড়ির আলো নিভিয়ে দেন অনেকে, কিন্তু তবুও হাতির দলকে ঠেকানো যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দা শিবু মাহাতো বলেন, “প্রায়ই এমনটা হচ্ছে, হাতি এসে আমাদের ফসল নষ্ট করছে, বাড়ির দেওয়াল ভেঙে দিচ্ছে। বাচ্চা থেকে বয়স্ক সবাই আতঙ্কে থাকে, কিন্তু বনদপ্তর তেমন কোনও স্থায়ী সমাধান করছে না।” এদিনও হাতির দল গ্রামে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই “হুলা পার্টি”—যারা মূলত লাঠি-ড্রাম বাজিয়ে হাতি তাড়ানোর কাজে নামেন—তাদের ডাকা হয়। তারা অনেক চেষ্টার পর হাতিগুলিকে কলেজের দিকে ঠেলে নিয়ে যেতে সক্ষম হলেও প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে হাতিদের কার্যত তাণ্ডব চলে গ্রামজুড়ে। অবশেষে ভোর চারটে নাগাদ বনদপ্তরের আধিকারিকেরা এসে হাতিগুলিকে আবারও গড়বেতার জঙ্গলের ভেতরে ফেরত পাঠাতে সক্ষম হন।

এই ঘটনাই প্রথম নয়। স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, প্রায় প্রতি মাসেই হাতির দল খাবারের খোঁজে জঙ্গল ছেড়ে গ্রামে প্রবেশ করছে। বিশেষ করে ধান তোলা বা আলু-পেঁয়াজ ফলানোর মৌসুমে হাতিরা নষ্ট করে দিচ্ছে গ্রামীণ জীবিকার মূল ভরসা—ফসল। শুধু তাই নয়, মাঝে মাঝে বাড়িঘর ভেঙে ফেলার ঘটনাও ঘটছে। গত বছর এই এলাকায় হাতির হানায় অন্তত ১২ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, বহু গবাদি পশু মারা গেছে। এ ছাড়া গ্রামের অর্থনীতির উপরও বড়সড় আঘাত পড়ছে। গড়বেতার এক চাষি হরিপদ সাঁতরা বলেন, “আমাদের সারা বছরের খাওয়ার ভাতটাই উঠে যাচ্ছে। এক রাতে সব শেষ করে দিচ্ছে হাতির দল। ক্ষতিপূরণ মেলে সামান্য, তাতে আমাদের ক্ষতি পূরণ হয় না।”বনদপ্তর অবশ্য দাবি করছে, তারা নিয়মিত নজরদারি করছে। পশ্চিম মেদিনীপুর বনদপ্তরের এক আধিকারিক জানান, “আমরা নিয়মিত হাতির চলাচল ট্র্যাক করি। তবে খাবারের অভাব, বনাঞ্চলের সঙ্কোচন, জলাশয় কমে যাওয়া—এই কারণেই হাতিরা লোকালয়ে চলে আসছে। আমরা হুলা পার্টি মোতায়েন করি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে ক্ষতিপূরণও দেওয়া হচ্ছে।” কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্ষতিপূরণের টাকাও সময়মতো হাতে আসে না, আর বনদপ্তরের সক্রিয়তা শুধু ঘটনার পরেই দেখা যায়।
বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞদের মতে, জঙ্গল ধ্বংস ও খাদ্যের সংকটের কারণেই হাতিরা মানুষের বসতিতে চলে আসছে। একসময় যে বিস্তীর্ণ অরণ্য ছিল, এখন তা ক্রমশ চাষের জমি ও ইটভাটার কারণে সঙ্কুচিত হচ্ছে। ফলে হাতির দল বাধ্য হয়েই খাবারের সন্ধানে গ্রামে আসছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামী দিনে মানুষ-প্রাণীর দ্বন্দ্ব আরও বাড়বে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, জঙ্গল এলাকায় পর্যাপ্ত খাদ্য ও জলসঞ্চয়ের ব্যবস্থা করতে হবে, নইলে মানুষ ও হাতি উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর পরিস্থিতি তৈরি হবে।এদিকে গ্রামের মানুষদের জীবনে ভয় ক্রমশ বেড়েই চলেছে। রাত নামলেই হাতির ভয়ে দরজা-জানালা বন্ধ করে আতঙ্কে রাত কাটান গ্রামবাসীরা। কেউ কেউ আবার দিনশেষে নিজেদের ঘর ছেড়ে আত্মীয়ের বাড়ি বা আশ্রয়কেন্দ্রে রাত কাটাচ্ছেন। শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে ভয় আরও বেশি। গ্রামবাসী সরলা মজুমদার বলেন, “বাচ্চারা সারারাত কাঁদে। ঘুমোতে পারে না। স্কুলেও যেতে ভয় পায়, কারণ যে কোনও সময় হাতির দল চলে আসতে পারে।”

ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, যদি এখনই বনভূমি সংরক্ষণ ও হাতিদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা না করা যায়, তবে এ ধরনের ঘটনা আরও ঘনঘন ঘটবে। মানুষের জীবন ও জীবিকার ক্ষতি ছাড়াও হাতিরাও ক্রমশ হিংস্র হয়ে উঠবে। ইতিমধ্যেই হাতিরা গ্রামে ঢুকে বারবার তাণ্ডব চালাচ্ছে, কিন্তু তাদেরও বেঁচে থাকার লড়াই আছে—যা মানুষ বুঝলেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছেন না প্রশাসন।গ্রামবাসীদের একটাই দাবি—বনদপ্তর শুধু হাতি তাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করুক। কারণ প্রতিবার হাতি জঙ্গলে ফেরানো গেলেও কয়েকদিন পরেই আবার ফিরে আসছে। যদি এই পরিস্থিতি চলতেই থাকে, তবে আগামী দিনে মানুষ ও হাতির সহাবস্থান বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।