Trinamool’s program to purify Shuvendu’s journey route with cow dung water:-উত্তরবঙ্গের রাজনীতি যেন ক্রমশই নাটকীয় রূপ নিচ্ছে, আর সেই নাটকের কেন্দ্রে এবার রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর কোচবিহার সফর। মঙ্গলবার সকাল থেকেই উত্তেজনা ছড়ায় ৩১ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে তাঁর যাত্রাপথে, বিশেষ করে জলপাইগুড়ির পাহাড়পুর মোড় এলাকায়। এখানে শুভেন্দুর কনভয় পৌঁছতেই বিক্ষোভে ফেটে পড়েন তৃণমূল কর্মীরা, পুলিশি নিরাপত্তা থাকা সত্ত্বেও স্লোগান, ধ্বনি আর পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে তাঁরা স্পষ্ট করে দেন—এই রাজ্যে বিভাজনের রাজনীতি চলবে না। যদিও শুভেন্দুর কনভয় থামেনি, কোনও রকম অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই গাড়িগুলি পেরিয়ে যায়, কিন্তু ঠিক তার কিছুক্ষণের মধ্যেই রাজপথের চেহারাই পালটে যায়। ঘটনাস্থলে পৌঁছে তৃণমূলের স্থানীয় নেতৃত্ব রাজপথে ঢেলে দেন গোবর জল, সঙ্গে গঙ্গাজল, আর শুরু হয় তথাকথিত ‘শুদ্ধিকরণ’ কর্মসূচি। তাঁদের বক্তব্য—ঘৃণা, সাম্প্রদায়িকতা এবং রাজনৈতিক বিভাজনের প্রতীক হিসেবে যিনি পরিচিত, তিনি যে পথ দিয়ে গেলেন সেই পথকে ‘পবিত্র’ করতে হবে। টিএমসিপি রাজ্য কমিটির সদস্য দেবজিৎ সরকার সাফ জানিয়ে দেন, “এই রাজ্যে ঘৃণার রাজনীতি বরদাস্ত করা হবে না। আমরা শুধু রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়, সাংস্কৃতিক প্রতিরোধও করছি। যারা বাংলার মাটিকে কলুষিত করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে এই প্রতীকী শুদ্ধিকরণই আমাদের জবাব।” ঘটনাটি রাজ্য রাজনীতির মূলধারাতেই তোলপাড় ফেলে দিয়েছে।

রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপির মধ্যে বহুদিন ধরেই উত্তরের জেলার দখল নিয়ে লড়াই চলেছে। ২০২১-এ উত্তরবঙ্গে বিজেপির বড় ভোট শতাংশ এবং একাধিক বিধানসভা আসন জয়ের পরে তৃণমূল এখানে ঘুঁটি শক্ত করতে মরিয়া, আর শুভেন্দু অধিকারী এখন বিজেপির অন্যতম মুখ। তাই তাঁর যেকোনো সফর ঘিরেই সজাগ থাকে তৃণমূল। তবে এবারের মতো শুদ্ধিকরণের নামে রাজপথে গোবর জল ঢালার কর্মসূচি প্রথম বললেই চলে। সামাজিক মাধ্যমে ছবি ছড়িয়ে পড়তেই বিতর্ক আরও বেড়ে যায়। কেউ একে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলছেন, কেউ বলছেন অশালীনতা, আবার কেউ কেউ তৃণমূলের সাংস্কৃতিক প্রতিবাদের অভিনব উপায় হিসেবেও দেখছেন এই কর্মসূচিকে। বিজেপির পক্ষ থেকে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করা হয়েছে। বিজেপি নেতা তথা উত্তরবঙ্গের সাংসদ নিশীথ প্রামাণিক বলেন, “তৃণমূল জানে শুভেন্দু যেখানে যান, সেখানেই মানুষ জড়ো হন। ওঁর জনপ্রিয়তাকে আটকাতে না পেরে এরা এমন নোংরা রাজনীতি করছে।
রাস্তায় গোবর জল ঢেলে বাংলার সংস্কৃতিকে অপমান করা হয়েছে।” অপরদিকে, তৃণমূল নেতৃত্ব বলছে, এই কর্মসূচি আসলে একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বার্তা। জলপাইগুড়ি জেলা তৃণমূল সভাপতি অরূপ বিশ্বাস বলেন, “বাংলার সংস্কৃতি, ভাষা, ঐক্য রক্ষার লড়াইয়ে আমরা কোনও আপস করব না। এই শুদ্ধিকরণ আসলে আমাদের প্রতিবাদের ভাষা।” তবে সাধারণ মানুষ এই ঘটনা নিয়ে দ্বিধায়। কেউ বলছেন, এতকিছু করে লাভ কী, সমস্যায় তো পড়ছে আমরাই। এলাকারই এক চা দোকানি বললেন, “পথে গোবর জল ফেললে আমাদের দোকান চলে কীভাবে? রাস্তা দিয়ে মানুষ চলবে কীভাবে?” অপরদিকে এক তরুণ কলেজছাত্রী জানান, “এটা দেখে অদ্ভুত লাগছে। রাজনীতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে একে অপরকে অপবিত্র বলেও প্রকাশ্যে বলা হচ্ছে। এইভাবে যদি তরুণ প্রজন্ম রাজনীতি দেখে, তাহলে রাজনীতি থেকে বিশ্বাস হারিয়ে যাবে।” রাজনীতির এই সংস্কৃতিতে এমন শুদ্ধিকরণ নতুন নয়। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক বিরোধিতায় প্রতীকী ‘শুদ্ধিকরণ’ বহুবার হয়েছে। উত্তর ভারতের কিছু রাজ্যে রাজনৈতিক নেতাদের সফরের পরে সেই রাস্তা ধুয়ে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে। তবে পশ্চিমবঙ্গে, বিশেষত উত্তরবঙ্গের মতো সংবেদনশীল এলাকায় এমন কর্মসূচি প্রথম। এর প্রভাব কী হতে পারে তা নিয়ে চিন্তিত রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও।

তাঁদের মতে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবেশে এমন কোনও ঘটনা খুব সহজেই সামাজিক অস্থিরতার রূপ নিতে পারে। একদিকে বিজেপি যখন উত্তরবঙ্গকে আলাদা রাজ্য করার ইস্যুতে মাঝেমধ্যেই আওয়াজ তোলে, তখন এমন কোনও ঘটনা নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। তাই প্রশাসনকেও বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে দেখতে হবে। কোচবিহারে মুখ্যমন্ত্রীর আগমন ও শুভেন্দুর সফরকে কেন্দ্র করে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যেকার এই টানাপোড়েন উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে আরও তীব্র হতে চলেছে বলেই মনে করা হচ্ছে। তৃণমূল এই কর্মসূচির মাধ্যমে দলের নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে একটি প্রতিবাদী মেজাজ তৈরি করতে চাইছে, আবার বিজেপি এই ঘটনাকে হাতিয়ার করে নিজেদের কর্মীদের আরও সক্রিয় করতে চাইছে। রাজনীতির এই পরিকাঠামোয় সাধারণ মানুষের স্বস্তি কোথায়? সেখানেই উঠছে প্রশ্ন। এক বৃদ্ধ কৃষক বলেন, “আমরা চাই রাস্তা-ঘাট হোক, খেত-খামারে জল আসুক, ছেলে-মেয়েরা চাকরি পাক। রাজনীতির নামে এত নাটক কেন? গোবর জল ফেলেই যদি সব ঠিক হত, তাহলে তো অনেক আগেই ঠিক হয়ে যেত।” তবে এটুকু নিশ্চিত, তৃণমূলের এই অভিনব প্রতিবাদ রাজ্যজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। শুদ্ধিকরণ কর্মসূচি নিয়ে তৈরি হয়েছে হাস্যরস, বিতর্ক, আবার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও। তৃণমূলের এক যুব নেতা বলেন, “আমরা চাই রাজনীতি হোক আদর্শ নিয়ে, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। শুভেন্দু অধিকারী বাংলার গরিমা নিয়ে যা বলেন, তা শুনে রক্ত গরম হয়ে যায়। তাই আমরা শান্তিপূর্ণ, প্রতীকী প্রতিবাদ করেছি।” এই ‘শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ’ কতটা গ্রহণযোগ্য সেটা সময় বলবে, কিন্তু এর মাধ্যমে যে রাজনীতি আরও সংঘর্ষমুখী, প্রতিক্রিয়াশীল ও চরম আবেগপ্রবণ হয়ে উঠছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আর রাজনৈতিক নেতাদের সফর ঘিরে এবার শুধু মিটিং-মিছিল নয়, রাস্তায় গোবর জল ও গঙ্গাজল ঢেলে ‘শুদ্ধি’ কর্মসূচি—এটাই এখন রাজনীতির নতুন চেহারা।